রাজধানীর গুলশান, বনানী, বারিধারা ও হাতিরঝিল- নামেই দেশের সবচেয়ে অভিজাত ও পরিকল্পিত এলাকার পরিচয়। অথচ এসব এলাকার ২ হাজার ৮২২টি ভবনের পয়ঃবর্জ্য সরাসরি লেকে গিয়ে পড়ছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে দূষণের সঙ্গে লড়াই করেও গুলশান-বনানী-বারিধারা ও হাতিরঝিলের পানি দূষণমুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, সমস্যাটি নতুন নয়। বছরের পর বছর ধরে নগরীর পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার দুর্বলতা, অপরিকল্পিত সংযোগ এবং সমন্বয়হীনতার কারণে লেকগুলোতে প্রতিনিয়ত বর্জ্য জমছে। অথচ রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এসব এলাকায় টেকসই পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তোলার বদলে এখন বাড়ির মালিকদের নিজস্ব অর্থে স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট বা এসটিপি স্থাপনের চাপ দেওয়া হচ্ছে।

গুলশান, বনানীসহ আশপাশের এলাকার পয়ঃবর্জ্য ঢাকার বাইরে নিয়ে শোধনের লক্ষ্যে ২০২৩ সালে দাসেরকান্দিতে ৩ হাজার ৭১২ কোটি টাকা ব্যয়ে পয়ঃশোধনাগার স্থাপন করে ঢাকা ওয়াসা। কিন্তু এত বিপুল অর্থ ব্যয়ে শোধনাগার নির্মাণের পরও সেখানে বর্জ্য পৌঁছানোর প্রয়োজনীয় পাইপলাইন তৈরি করা হয়নি।

এখন সেই সংযোগ নেটওয়ার্ক তৈরির জন্য প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার নতুন প্রকল্প হাতে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা ওয়াসা। অর্থাৎ যে অবকাঠামোটি শোধনাগার নির্মাণের সময়ই সমন্বিতভাবে করার কথা ছিল, সেটি করতে এখন আবার নতুন প্রকল্প, নতুন ব্যয় এবং আরও কয়েক বছর সময়ের প্রয়োজন হচ্ছে।

রাজউকের পক্ষ থেকে লেকপাড়ের ভবনগুলোকে নিজস্ব এসটিপি স্থাপনের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রিয়াজুল ইসলাম বলেছেন, ভবন মালিকরা এসটিপি না করলেও অন্তত সেপটিক ট্যাংক ও সোকওয়েল তৈরি করতে পারেন। চিঠি দেওয়ার পর অনেক ভবন কর্তৃপক্ষ সে অনুযায়ী কাজও শুরু করেছে বলে দাবি রাজউকের।

তবে আবাসিক সোসাইটিগুলোর প্রতিনিধিরা বলছেন, একটি ভবনে এসটিপি স্থাপনে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে। একই এলাকায় শত শত ভবনের জন্য আলাদা আলাদা এসটিপি স্থাপন করলে সেটি যেমন ব্যয়বহুল হবে, তেমনি রক্ষণাবেক্ষণেও তৈরি হবে নতুন সমস্যা। তাদের দাবি, পুরো এলাকার জন্য একটি আধুনিক কেন্দ্রীয় পয়ঃশোধন ব্যবস্থা গড়ে তোলাই কার্যকর সমাধান।

নিকেতন সোসাইটির অফিস সেক্রেটারি আব্দুর রউফ বলেন, রাজউক একের পর এক চিঠি দিয়ে ভবন মালিকদের এসটিপি স্থাপনের নির্দেশ দিচ্ছে। কিন্তু তাদের পক্ষ থেকে গুলশান এলাকার জন্য একটি কেন্দ্রীয় এসটিপি নির্মাণের দাবি জানানো হয়েছে।

গুলশান সোসাইটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ এ হাবিব রানা প্রশ্ন তুলেছেন, বিশ্বের অন্যান্য বড় শহরে যেখানে কেন্দ্রীয় পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়, সেখানে ভবন মালিকদের ওপর আলাদা করে এসটিপি নির্মাণের দায় চাপানোর যৌক্তিকতা কতটা।

প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ১৪ বছর আগে হাতিরঝিল প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। রাজধানীর সৌন্দর্য, পরিবেশ ও জলাবদ্ধতা ব্যবস্থাপনায় প্রকল্পটি ছিল বড় উদ্যোগ। কিন্তু এত বছর পরও হাতিরঝিলের পানি দূষণমুক্ত করা যায়নি।

একই চিত্র গুলশান, বনানী ও বারিধারার লেকগুলোতেও। একদিকে সৌন্দর্যবর্ধন ও অবকাঠামো নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে, অন্যদিকে লেকের পানিতে প্রতিনিয়ত ঢুকছে পয়ঃবর্জ্য। ফলে উন্নয়ন প্রকল্পের স্থায়িত্ব ও পরিকল্পনার কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।

বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর গুলশান এলাকার লেকগুলো দূষণমুক্ত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহেরও বিষয়টি নিয়ে তৎপর হয়েছেন। লেকপাড়ের ভবনগুলোর স্যুয়ারেজ ব্যবস্থার তথ্য সংগ্রহের জন্য রাজউককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে ২ হাজার ৮২২টি ভবনের পয়ঃবর্জ্য যদি সরাসরি লেকে গিয়ে পড়ে, তাহলে এটি শুধু পরিবেশদূষণের ঘটনা নয়; এটি নগর ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের দুর্বলতারও প্রকাশ। একটি শোধনাগার নির্মাণে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করার পর তার সঙ্গে বর্জ্য পৌঁছানোর পাইপলাইন না থাকা যেমন পরিকল্পনার বড় ঘাটতি, তেমনি এখন সেই ঘাটতি পূরণে আবার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করছে।

সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো, নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নে যদি আরও তিন-চার বছর সময় লাগে, ততদিনে লেকগুলোর পরিবেশগত ক্ষতি আরও বাড়তে পারে। ফলে শুধু ভবন মালিকদের ওপর দায় চাপিয়ে নয়, গুলশান-বনানী-বারিধারা ও হাতিরঝিলের জন্য একটি সমন্বিত, কেন্দ্রীয় ও দীর্ঘমেয়াদি পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা দ্রুত বাস্তবায়ন করা জরুরি।

রাজধানীর অভিজাত এলাকার লেকেই যদি পয়ঃবর্জ্য সরাসরি গিয়ে পড়ে, তাহলে দেশের নগর ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন পরিকল্পনা কতটা কার্যকর- সেই প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version