২০০৪ সালের ২১ আগস্ট। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনার সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। মুহূর্তেই রক্তাক্ত হয়ে ওঠে সমাবেশস্থল। একের পর এক বিস্ফোরণে প্রাণ হারান আওয়ামী লীগের ২৪ নেতাকর্মী। আহত হন তিন শতাধিক মানুষ। গুরুতর আহতদের অনেকে আজও সেই দিনের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন। নিহতদের মধ্যে ছিলেন আওয়ামী লীগ নেত্রী ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমান।

হামলার দুই দশক পেরিয়ে আজ ২২ বছরে পা দিয়েছে আলোচিত ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলা। দীর্ঘ তদন্ত, পুনঃতদন্ত, অভিযোগপত্র, বিচার ও দণ্ডের পর সর্বোচ্চ আদালতে এসে মামলার সব আসামিই খালাস পেয়েছেন। ফলে ভয়াবহ ওই হত্যাকাণ্ডে প্রকৃত দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে কি না- এ প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বড় হয়ে সামনে এসেছে।

২১ আগস্টের হামলার ঘটনায় মতিঝিল থানায় পুলিশ বাদী হয়ে হত্যা ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে দুটি মামলা করে। এজাহারে বলা হয়, তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যেই বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে সমাবেশে গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। মামলার নথিতে হামলায় ব্যবহৃত আর্জেস গ্রেনেড পাকিস্তান থেকে আনার কথাও উল্লেখ করা হয়।

২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে মামলার তদন্ত নতুন করে শুরু হয়। তদন্ত শেষে সিআইডির তৎকালীন এএসপি ফজলুল কবীর ২০০৮ সালের ১১ জুন হত্যা ও বিস্ফোরক আইনের দুই মামলায় অভিযোগপত্র দেন। সেখানে বিএনপি নেতা আবদুস সালাম পিন্টু, তাঁর ভাই মাওলানা তাজউদ্দিন এবং হরকাতুল জিহাদ (হুজি) নেতা মুফতি হান্নানসহ ২২ জনকে আসামি করা হয়।

এরপর ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত মামলার অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন। ২০১১ সালের ৩ জুলাই তৎকালীন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ আরও ৩০ জনকে আসামি করে সম্পূরক অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। এতে মামলায় মোট আসামির সংখ্যা দাঁড়ায় ৫২।

পরে অন্য মামলায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ায় জামায়াতে ইসলামী নেতা আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ এবং হুজি নেতা আবদুল হান্নান ও শরীফ শাহেদুল ইসলাম বিপুলের নাম মামলা থেকে বাদ পড়ে। শেষ পর্যন্ত আসামির সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৯ জনে।

দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর ঢাকার বিচারিক আদালত ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তৎকালীন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ আরও ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। বাকি ১১ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে ১৪ জন ছিলেন হরকাতুল জিহাদের সদস্য।

রায়ের পর কারাগারে থাকা আসামিরা হাইকোর্টে আপিল করেন। একই সঙ্গে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের সাজা অনুমোদনের জন্য ডেথ রেফারেন্সও হাইকোর্টে পাঠানো হয়।

৫ আগস্টের কথিত ছাত্র আন্দোলনে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর ২১ আগস্ট মামলায় বড় ধরনের মোড় আসে। আসামিদের করা আপিল মঞ্জুর করে হাইকোর্ট সবাইকে খালাস দেন। একই সঙ্গে মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য পাঠানো ডেথ রেফারেন্সও খারিজ করে দেওয়া হয়।

হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়, বিচারিক আদালত দুর্বল ও শোনা সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে আসামিদের সাজা দিয়েছিলেন। সাক্ষীরা হামলার বর্ণনা দিলেও কে গ্রেনেড ছুড়েছেন, তা সুনির্দিষ্টভাবে বলতে পারেননি।

আদালত আরও বলেন, মামলার পুনঃতদন্তের যে আদেশ দেওয়া হয়েছিল, তা ছিল ‘আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত’। ওই পুনঃতদন্তের ভিত্তিতে দেওয়া সম্পূরক অভিযোগপত্রকেও ‘অবৈধ’ বলে উল্লেখ করেন হাইকোর্ট।

রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করলে আসামিদের যেভাবে দোষী সাব্যস্ত করে সাজা দেওয়া হয়েছিল, তা আইনগতভাবে টেকসই নয়।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে মুফতি হান্নানের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিকে কেন্দ্র করেও গুরুতর প্রশ্ন তোলা হয়। আদালত বলেন, তাঁর জবানবন্দির ভিত্তিতে যে দ্বিতীয় অভিযোগপত্র নেওয়া হয়েছিল, সেটি বেআইনি। এমনকি প্রথম অভিযোগপত্রের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে, কারণ সেটিও মুফতি হান্নানের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির ওপর নির্ভরশীল ছিল।

আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মুফতি হান্নান পরে তাঁর সেই জবানবন্দি প্রত্যাহার করে নেন। তদন্ত কর্মকর্তা ও ম্যাজিস্ট্রেট ছাড়া ২৫ সাক্ষীর কেউই বলেননি, তাঁরা কে গ্রেনেড ছুড়তে দেখেছেন কিংবা হামলাকারী হিসেবে কাউকে শনাক্ত করতে পেরেছেন।

ফলে প্রকৃত হামলাকারী বা হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী কারা- তা নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য-প্রমাণে প্রতিষ্ঠিত হয়নি বলে হাইকোর্ট মনে করেন। আদালত স্পষ্ট করেন, কেবল কোনো স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করে অন্য কোনো ব্যক্তিকে সাজা দেওয়া যায় না।

২০২৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর প্রকাশিত হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ে ২১ আগস্টের হামলাকে দেশের ইতিহাসের ‘জঘন্য ও মর্মান্তিক ঘটনা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। নিহতদের মধ্যে আইভি রহমানসহ অনেক মানুষের প্রাণহানির কথা তুলে ধরে আদালত বলেন, হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনে সঠিক ও স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন।

ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে মামলাটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দক্ষ ও উপযুক্ত তদন্ত সংস্থার মাধ্যমে নতুন করে তদন্তের প্রয়োজনীয়তার কথাও হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ে উঠে আসে।

তবে ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত রায়ে আপিল বিভাগ হাইকোর্টের ওই পর্যবেক্ষণের অংশটি বাদ দেন। ফলে মামলার আসামিদের খালাস বহাল থাকলেও ২১ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত দায়ীদের শনাক্ত ও বিচারের আওতায় আনার বিষয়ে নতুন তদন্তের কোনো নির্দেশনা আর রায়ে থাকেনি।

২১ আগস্টের ভয়াবহ হামলার ২২ বছর পেরিয়ে গেলেও নিহত ও আহতদের পরিবারগুলোর সামনে এখন নতুন বাস্তবতা। যে মামলায় একসময় ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড এবং ১৯ জনের যাবজ্জীবন হয়েছিল, সেই মামলার সব আসামিই শেষ পর্যন্ত সর্বোচ্চ আদালতের বিচারে খালাস পেয়েছেন।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, ২১ আগস্ট মামলায় সর্বোচ্চ আদালত সবাইকে নির্দোষ বলে রায় দিয়েছেন। কিন্তু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের খুঁজে বের করার বিষয়ে রায়ে কোনো নির্দেশনা নেই। তাঁর মতে, এতে হতাহতদের পরিবার প্রকৃত অর্থে বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শিশির মনিরের মতে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মামলা পরিচালনা করা হলে শেষ পর্যন্ত এমন পরিণতিই হয়। তাঁর ভাষায়, ক্ষমতায় থাকা সরকার নিজেদের মতো করে মামলা পরিচালনা করলে প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের পথ জটিল হয়ে পড়ে। আগের সরকার এই মামলায় যেভাবে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে সাজা দিয়েছিল, পরবর্তী সময়ে সেই প্রক্রিয়া ভেঙে পড়ায় প্রকৃত বিচার পাওয়ার পথও বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

২১ আগস্ট শুধু একটি রাজনৈতিক সমাবেশে হামলার ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তাক্ত অধ্যায়গুলোর একটি। ২৪ জনের মৃত্যু, শত শত মানুষের আহত হওয়া এবং দীর্ঘ ২২ বছরের বিচারিক পথ পেরিয়ে মামলার সব আসামির খালাস- সব মিলিয়ে ঘটনাটি এখন নতুন করে বিচার ও তদন্তের প্রশ্ন সামনে এনেছে।

দুই দশকের বেশি সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর ২১ আগস্ট মামলার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন শুধু একটি মামলার নিষ্পত্তি নয়; বরং ভয়াবহ ওই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন এবং হতাহতদের পরিবারের কাছে ন্যায়বিচার পৌঁছে দেওয়া।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version