বিশ্বজুড়ে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানি সীমাবদ্ধতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্নের মধ্যে ভারত থেকে রেকর্ড পরিমাণ ডিজেল আমদানি করেছে তুরস্ক। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যে ভারতীয় পরিশোধিত জ্বালানির ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব নতুন করে সামনে এসেছে।

আন্তর্জাতিক কমোডিটি ডেটা প্রতিষ্ঠান কেপলার (Kpler)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্টে তুরস্ক ভারত থেকে দৈনিক ১ লাখ ২০ হাজার ব্যারেলেরও বেশি ডিজেল আমদানি করেছে। ২০১৭ সাল থেকে সংরক্ষিত কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, এটিই তুরস্কের জন্য ভারতীয় ডিজেল আমদানির সর্বোচ্চ মাসিক মাত্রা।

এই পরিবর্তনের পেছনে অন্যতম কারণ রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা। ইউক্রেনীয় হামলায় রুশ শোধনাগারগুলোর কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পর মস্কো ডিজেল রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করে। ফলে তুরস্কের ঐতিহ্যগত রুশ জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়। আগস্টে তুরস্কে রাশিয়ার ডিজেল সরবরাহ নেমে আসে দৈনিক প্রায় ৮০ হাজার ব্যারেলে, যেখানে বছরের আগের মাসগুলোতে তা ২ লাখ ব্যারেলের ওপরে ছিল।

রাশিয়ার সঙ্গে তুরস্কের জ্বালানি বাণিজ্যের গভীর সম্পর্কের চিত্রও এতে স্পষ্ট। ২০২৫ সালে তুরস্কের ডিজেল আমদানির প্রায় ৮৫ শতাংশই রাশিয়া থেকে এসেছিল, যার পরিমাণ ছিল দৈনিক প্রায় ২ লাখ ৮১ হাজার ব্যারেল। কিন্তু আগস্টে রাশিয়ার অংশ নেমে আসে প্রায় ২০ শতাংশে।

অন্যদিকে, ভারতের শক্তিশালী তেল পরিশোধন সক্ষমতা তুরস্কের জন্য বিকল্প সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকেও তুরস্কের ডিজেল আমদানি বেড়ে দৈনিক প্রায় ৯০ হাজার ব্যারেলে পৌঁছেছে। কেপলারের হিসাবে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র- দুই দেশ থেকেই আগস্টের আমদানিই ছিল ২০১৭ সালের পর সর্বোচ্চ।

তবে জ্বালানি প্রবাহের আরেকটি ডেটাসেট এনার্জি অ্যাসপেক্টস ভারতের সরবরাহের পরিমাণ প্রায় ৭৪ হাজার ব্যারেল এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৭০ হাজার ব্যারেল বলে অনুমান করেছে। অর্থাৎ বিভিন্ন ডেটা উৎসে পরিমাণের পার্থক্য থাকলেও ভারত থেকে তুরস্কের ডিজেল আমদানির উল্লেখযোগ্য উত্থান নিয়ে দুই পক্ষের তথ্যেই মিল রয়েছে।

রাশিয়ার সরবরাহ সংকোচন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকির কারণে তুরস্ককে অ-রুশ উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ বাড়াতে হচ্ছে। এর ফলে ভারত, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে তুরস্কের জ্বালানি নির্ভরতার নতুন ভারসাম্য তৈরি হচ্ছে।

সাম্প্রতিক প্রবণতা একই সঙ্গে দেখাচ্ছে, ভারত-রাশিয়ার দীর্ঘদিনের জ্বালানি বাণিজ্যিক সম্পর্ক বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখছে। ভারত নিজেও রাশিয়ার অন্যতম বড় অপরিশোধিত তেল ক্রেতা হিসেবে রয়ে গেছে, যদিও আগস্টে রাশিয়া থেকে ভারতের আমদানি কিছুটা কমেছে।

অর্থাৎ, রাশিয়ার সরবরাহে সাময়িক সংকট তুরস্ককে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের দিকে আরও বেশি ঝুঁকিয়েছে; আর ভারতীয় শোধনাগারগুলোর সক্ষমতা দেশটিকে বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যে আরও গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী হিসেবে সামনে নিয়ে এসেছে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version