দেশের শিল্প খাতে দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে বারবার গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। শিল্প মালিকদের দাবি, গ্যাসের অভাবে দেশের অর্ধেকেরও বেশি টেক্সটাইল ও সুতা উৎপাদনকারী মিল এখন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে তৈরি পোশাক, ইস্পাত, কাগজ, সিরামিক, পার্টিকেল বোর্ডসহ গ্যাসনির্ভর বিভিন্ন শিল্পে। অনেক কারখানা অর্ধেকেরও কম সক্ষমতায় চলছে।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল জানিয়েছেন, সংগঠনটির ১ হাজার ৮০০-এর বেশি সদস্যের মধ্যে ৯০০-এরও বেশি টেক্সটাইল মিল বর্তমানে গ্যাস সংকটের কারণে পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। ফলে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়ার পাশাপাশি উদ্যোক্তারা প্রতিদিন বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।

গত ৬ আগস্ট বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ ব্যবসায়ী ও শিল্প মালিকদের গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতির আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই আশ্বাসের পরও শিল্পাঞ্চলগুলোতে কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হয়নি বলে অভিযোগ উদ্যোক্তাদের।

নারায়ণগঞ্জ, সাভার, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, মানিকগঞ্জসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলের কারখানা মালিকরা বলছেন, কোথাও কোথাও সাময়িকভাবে গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়লেও তা স্থায়ী হয়নি। বরং কয়েক দিন পর আবারও সংকট তীব্র হয়েছে।

বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমের ভাষ্য অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জে একদিন গ্যাস সরবরাহে সামান্য উন্নতি দেখা গেলেও পরদিনই পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে যায়।

নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের একটি স্পিনিং মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, তার কারখানায় গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নেমে এসেছে। অথচ সরকার শিল্পকারখানায় নির্দিষ্ট মাত্রায় গ্যাস চাপ নিশ্চিত করার কথা জানিয়েছিল।

তার দাবি, কারখানাটি প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি টাকা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে। উৎপাদন বন্ধ থাকলেও শ্রমিকদের বেতন, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য স্থায়ী ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। দীর্ঘদিন এ অবস্থা চললে অনেক উদ্যোক্তার পক্ষে শ্রমিকদের বেতন ও গ্যাস-বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করাও কঠিন হয়ে পড়বে।

শিল্প মালিকদের আশঙ্কা, জুলাই ও আগস্ট মাসের বেতন-বোনাস, ব্যাংক ঋণের কিস্তি এবং ইউটিলিটি বিল পরিশোধে ব্যর্থ হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।

গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে নরসিংদীর মাধবদীর তাঁতশিল্পে। উৎপাদন বন্ধ থাকায় উৎপাদনভিত্তিক মজুরিতে কাজ করা শ্রমিকদের আয়ও বন্ধ হয়ে গেছে।

নরসিংদী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি আবদুল্লাহ আল মামুনের দাবি, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুতের দাবিতে তাঁত শ্রমিকরা সড়কে নামার চেষ্টা করেছিলেন। তবে মাধবদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কামাল হোসেন এমন কোনো বিক্ষোভের খবর অস্বীকার করেছেন। ফলে এ বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া গেছে।

শিল্প উদ্যোক্তাদের প্রশ্ন- একদিকে সরকার দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার আশ্বাস দিচ্ছে, অন্যদিকে বাস্তবে কারখানায় গ্যাসের চাপ শূন্যের কাছাকাছি। তাহলে সরকারের প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন কোথায়?

বিএনপি সরকারের আমলে শিল্প ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় এমন দীর্ঘস্থায়ী সংকট তৈরি হওয়া নিয়ে ব্যবসায়ী মহলে অসন্তোষ বাড়ছে। শিল্প মালিকদের মতে, শুধু আশ্বাস দিয়ে শিল্পের চাকা সচল রাখা সম্ভব নয়; প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ এবং কার্যকর সংকট ব্যবস্থাপনা।

বিশেষ করে দেশের রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান খাত তৈরি পোশাকশিল্প যখন টেক্সটাইল ও স্পিনিং মিলের ওপর নির্ভরশীল, তখন কাঁচামাল উৎপাদনকারী কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়া পুরো সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে রপ্তানি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও সরকারের রাজস্ব আয়ে।

গত ২১ জুলাই মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড ও কারিগরি সমস্যার পর জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এরপর থেকেই দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে গ্যাস সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে।

তবে শিল্প মালিকদের বক্তব্য, সংকটের কয়েক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও কার্যকর ও স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় এখন পরিস্থিতি শুধু জ্বালানি সংকটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই- এটি শিল্প উৎপাদন, শ্রমিকের আয়, বিনিয়োগ এবং দেশের অর্থনীতির ওপর সরাসরি আঘাত হানছে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version