বাংলাদেশের গত দেড় দশকের উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলের অর্জনকে মূল্যায়ন করেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ইস্টার্ন হেরাল্ড’। সংবাদমাধ্যমটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ক্ষমতার পালাবদল কিংবা আইনি প্রক্রিয়া নয়- দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং মানুষের জীবনমানের পরিবর্তনই শেষ পর্যন্ত ইতিহাসে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও অবকাঠামো, স্বাস্থ্যসেবা, নারীর কর্মসংস্থান এবং দারিদ্র্য বিমোচনে অগ্রগতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, কয়েক দশক আগে যে বাংলাদেশকে নানা সংকট ও সীমাবদ্ধতার দেশ হিসেবে দেখা হতো, সেই দেশই ধারাবাহিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে।

‘দ্য ইস্টার্ন হেরাল্ড’-এর বিশ্লেষণে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরকে শেখ হাসিনা সরকারের অন্যতম উল্লেখযোগ্য অর্জন হিসেবে দেখানো হয়েছে। শিল্পায়ন, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

বিশেষ করে বিদ্যুৎ খাতে উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ সংযোগ সম্প্রসারণ এবং বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নকে বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদনটিতে দারিদ্র্য কমানো এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার বিস্তার এবং নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশের সামাজিক সূচকে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

নারীর কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ বৃদ্ধিকেও বাংলাদেশের পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে বিবেচনা করেছে সংবাদমাধ্যমটি।

উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি শেখ হাসিনার মানবিক ও আন্তর্জাতিক ভূমিকার কথাও প্রতিবেদনে গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে আশ্রয় দেওয়ার সিদ্ধান্তের কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শেখ হাসিনা প্রশংসিত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়।

রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনাকে ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ হিসেবে অভিহিত করার বিষয়টিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর পক্ষে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকার কথা বলা হয়েছে।

তবে প্রতিবেদনে শেখ হাসিনার শাসনামলের উন্নয়ন ও অর্জনের পাশাপাশি তাঁর ক্ষমতাচ্যুতি এবং পরবর্তী রাজনৈতিক ও আইনি পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা করা হয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে তার বিরুদ্ধে চলমান আইনি প্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক পালাবদলের পেছনে কতটা রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে, তা নিয়ে বিতর্কের সুযোগ রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে ইঙ্গিত করা হয়েছে।

সংবাদমাধ্যমটির বিশ্লেষণে বলা হয়, কোনো দেশের ইতিহাসে একজন রাজনৈতিক নেতার মূল্যায়ন শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়ের রাজনৈতিক ঘটনা দিয়ে করা হয় না। বরং দীর্ঘ সময়ের নীতি, অর্থনৈতিক পরিবর্তন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং সাধারণ মানুষের জীবনে তাঁর প্রভাবও ইতিহাসের বিচারে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

রাজনীতির পরিবর্তন সময়ের সঙ্গে বদলে যেতে পারে, কিন্তু একটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন ও মানুষের জীবনমানের পরিবর্তনের প্রভাব সহজে মুছে যায় না। শেখ হাসিনার প্রায় ১৫ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোয় যে পরিবর্তন এসেছে, ভবিষ্যতে ইতিহাসে তাঁর মূল্যায়নে এসব অর্জন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

অর্থাৎ, রাজনৈতিক বিতর্ক, ক্ষমতার পালাবদল কিংবা আইনি লড়াইয়ের বাইরে বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় শেখ হাসিনার দীর্ঘমেয়াদি ভূমিকা কী ছিল- সময় ও ইতিহাসের বিচারে সেই প্রশ্নের উত্তরই তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের চূড়ান্ত মূল্যায়নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version