আদিত্য প্রতাপ ঘোষের কলাম

রাজনীতির সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা ক্ষমতায় থাকাকালে নয়, ক্ষমতার বাইরে থাকাকালে। যখন চারপাশে প্রশংসার জোয়ার থাকে, যখন ক্ষমতা মুঠোয় থাকে, তখন সমর্থকের অভাব হয় না। কিন্তু যখন ক্ষমতা হারানো যায়, দল আর রাষ্ট্র কঠিন সময় পার করে, সমালোচনা, আক্রমণ, অনিশ্চয়তা এবং ভয়, সংশয় ঘিরে ধরে, তখনই বোঝা যায় কার অবস্থান বিশ্বাসের, আর কার অবস্থান সুবিধার!

চলুন আলাপ করা যাক দুই পরিচিত অভিনয়শিল্পীকে নিয়েই। মেহের আফরোজ শাওন এবং সায়নী ঘোষ। দুজনই অভিনয় জগতের পরিচিত মুখ। শাওন একক সত্ত্বা তৈরিকারী। সায়নী অভিনেত্রী হিসেবে মাঝারি ঘরানার। কিন্তু আজ তাঁদের নিয়ে আলোচনা শিল্পীসত্ত্বা নয়, বরং রাজনৈতিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে।

বাংলাদেশে মেহের আফরোজ শাওনের নাম দীর্ঘদিন ধরেই আওয়ামী লীগের সমর্থক হিসেবে আলোচিত। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকুক বা না থাকুক, তিনি নিজের অবস্থান প্রকাশ করতে কখনো দ্বিধা করেননি। অনেকে শাওনকে ‘সৌন্দর্যের সাথে মেধার অপূর্ব সমন্বয়’ বলে থাকেন। রাজনৈতিক পালাবদলের পর যখন আওয়ামী লীগের নাম নেওয়াও অনেকের কাছে অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছে, তখনও শাওন তাঁর অবস্থান থেকে সরে আসেননি একবিন্দু। তাঁর অতীত ইতিহাস রাজনৈতিক সুবিধা নেয়া বা পদপদবীর আলখাল্লায় ছিলনা, অথচ নৈব্যক্তিক চিন্তার সুস্থতার জেরে তাঁর গ্রামের বাড়িটিও জঙ্গীদের আক্রমণের মুখে পড়ে। তাঁর বাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটেছে, তাঁকে নিয়ে তীব্র সমালোচনা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের আক্রমণের মুখে পড়তে হয়েছে। কিন্তু এসবের পরও তিনি নিজের রাজনৈতিক অবস্থান অস্বীকার করেননি। তাঁকে যারা সমর্থন করেন, তারা এটিকে কেবল রাজনৈতিক আনুগত্য নয়, বরং ব্যক্তিগত সাহসের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখেন। শাওন ব্যক্তিসুমুর্ল্যে ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জনের চেয়ে দল আর রাষ্ট্রের ওপর দায়কেই প্রাধান্য দিয়েছেন – যা বিরল।।।

অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে সায়নী ঘোষ ছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের অন্যতম আলোচিত মুখ। একজন অভিনেত্রী থেকে রাজনীতিক হয়ে ওঠার যাত্রায় তিনি দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের আস্থা অর্জন করেছিলেন। সদ্য সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক পরিসরে জায়গা করে নেওয়া, দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাওয়া এবং জাতীয় রাজনীতিতে তৃণমূলের প্রতিনিধিত্ব করা- সব মিলিয়ে তাঁর উত্থান ছিল দ্রুত ও উল্লেখযোগ্য। সেই সায়নী তৃণমূল কংগ্রেসের ক্ষমতা হারানো এবং দল ছিন্নভিন্ন দশার চলমান।কালে চোখ উল্টি দিলেন! চলে গেলেন এতকাল যাদের ”শত্রু” খেলায় গণিপাত করেছেন তাদেরই দলে!

কিন্তু এখানেই রাজনৈতিক দর্শনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সামনে আসে। আদর্শ ধরে রাখা কখনোই সহজ নয়। বিশেষ করে যখন চারপাশের পরিস্থিতি বদলে যায়, যখন সমর্থনের বদলে বিরোধিতা আসে, যখন প্রশংসার বদলে সমালোচনা আসে, তখন নিজের অবস্থানে অটল থাকা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। রাজনীতির এই ‘গণেশ ওল্টানো’ ক্রান্তিকালে সবাই অটল অটুট আদর্শ ধরে রাখতে পারেনা। সুবিধা পাওয়া মাত্র অবস্থান বদলে ফেলা তুলনামূলক সহজ। ক্ষমতার বাতাস যেদিকে বইছে, সেদিকে নিজেকে ভাসিয়ে দেওয়াও সহজ। কিন্তু কোনো দৃশ্যমান লাভ না পেয়েও একটি আদর্শকে ধারণ করা, কিংবা নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের বিশ্বাসকে অক্ষুণ্ন রাখা মোটেও সহজ কাজ নয়। আরও কঠিন হলো কিছু পাওয়া, পরিচিতি পাওয়া, সুযোগ পাওয়া, না পেয়েও সেই বিশ্বাসকে বিসর্জন না দেওয়া- এটা পরীক্ষায় সর্বোচ্চ পাশমার্ক।

ইতিহাসে আমরা দেখেছি, সুবিধাভোগীর সংখ্যা সবসময় বেশি থাকে। কিন্তু আদর্শিক মানুষের সংখ্যা খুব বেশি হয় না। কারণ আদর্শের পথে লাভের নিশ্চয়তা নেই, আছে ত্যাগের সম্ভাবনা; আছে সমালোচনার ঝুঁকি; আছে একাকী হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা। তবুও কিছু মানুষ তাঁদের বিশ্বাস আঁকড়ে ধরে থাকেন। ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তাঁদেরকেই বেশি মনে রাখে।

ব্যক্তিগত আবেশে না হিসাব করে এই দুই শিল্পীকে পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে কি আনলাম! একজন এমন একজন নেত্রীর কাছ থেকে রাজনৈতিক স্বীকৃতি, ক্ষমতা ও মর্যাদা পেয়েও দূরত্ব তৈরি করছেন যার কাধে সওয়ার হয়েই আজ তিনি এতদূর! তিনি সায়নী ঘোষ। আর অন্যজন কোনো দৃশ্যমান রাজনৈতিক লাভ না পেয়েও নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন ইতিহাসের সবচেয়ে পরীক্ষামূলক সময়ে, আওয়ামী লীগ এবং বাংলাদেশের।।

রাজনীতিতে মতপার্থক্য থাকতে পারে, অবস্থান বদলানোর অধিকারও গণতান্ত্রিক রাজনীতির অংশ। কেউ যদি রাজনৈতিকভাবে নতুন সিদ্ধান্ত নেন, সেটি তাঁর ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক অধিকার। কিন্তু জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয় তখনই, যখন সেই সিদ্ধান্তকে মানুষ কৃতজ্ঞতা, আনুগত্য এবং আদর্শের মানদণ্ডে বিচার করতে শুরু করে।

রাজনৈতিক বিশ্বাস তখনই অর্থবহ, যখন সেটি ঝুঁকির মধ্যেও টিকে থাকে। যখন কোনো অবস্থান ধরে রাখার জন্য সামাজিক মূল্য দিতে হয়, তখনই বোঝা যায় সেই অবস্থান কতটা গভীর। এ কেবল রাজনীতির জটিল মাঠে নয়, জীবনের সকল ক্ষেত্রে, বিপদেই তো কেবল বন্ধুর পরিচয়!

একটি পুরোনো সত্য আবার সামনে আসে। রাজনীতিতে সবাই ক্ষমতার সময়ে পাশে থাকে। কিন্তু ক্ষমতা হারানোর পর, আক্রমণের মুখে, সমালোচনার ঝড়ে, কিংবা অনিশ্চয়তার অন্ধকারে কারা পাশে থাকে ইতিহাস শেষ পর্যন্ত সেটাই বেশি মনে রাখে। তাই আজকের এই তুলনা আসলে দুই ব্যক্তির তুলনা নয়। এটি দুই ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতির তুলনা। একদিকে সুবিধার সঙ্গে সম্পর্কিত রাজনীতি, অন্যদিকে বিশ্বাসের সঙ্গে সম্পর্কিত রাজনীতি। একদিকে ক্ষমতার কেন্দ্রের দিকে এগিয়ে যাওয়ার রাজনীতি, অন্যদিকে প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের অবস্থান ধরে রাখার রাজনীতি। কারণ রাজনীতিতে পদ পাওয়া বড় কথা নয়, বড় কথা হলো বিশ্বাস ধরে রাখা, আদর্শে অটুট থাকা। পদ, ক্ষমতা, প্রভাব কিংবা জনপ্রিয়তা এসব সময়ের সঙ্গে আসে, আবার চলে যায়। কিন্তু আদর্শের প্রতি অবিচল থাকা এমন এক গুণ, যা মানুষের চরিত্রকে সংজ্ঞায়িত করে।

শেষ পর্যন্ত সময়ই বিচার করবে কে সঠিক, কে ভুল। কিন্তু একটি সত্য বারবার ফিরে আসে, সুবিধা পেয়ে পাশে থাকা সহজ, সুবিধা হারিয়ে পাশে থাকা কঠিন। আর সুবিধার সময়ে সুবিধা না নিয়ে ক্রান্তিলগ্নে সেই আদর্শের জন্য লড়াই করা ব্যক্তিকে সুমানুষ বলে। কিছু না পেয়েও, কিংবা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েও যদি কেউ নিজের বিশ্বাস ও আদর্শকে অটুট রাখতে পারেন, তবে সেটি নিঃসন্দেহে সাহস, দৃঢ়তা এবং রাজনৈতিক সততার এক বিরল উদাহরণ।

এই রাজনীতির বয়ানে নিজো দলের ক্রান্তিকালে সায়নী হারিয়ে গেলেন সুবিধাবাদী চেহারা দেখিয়েই। দলীয় আদর্শ, রাষ্ট্রকে ‘ঔন’ করা আর একটি আদর্শকে ঠায় অবিচলে রাখা চাট্টিখানা কথা যে নয়!

আর নক্ষত্রের প্রায় মৃত্যুর কালে দূরে, ওই দূরে বাতিঘর-সম আলো জ্বালিয়েই যাচ্ছেন মেহের আফরোজ শাওন। তিনি রইলেন, যেমন রয় রাতের সকল তারা দিনের আলোর গভীরে।।

আদিত্য প্রতাপ ঘোষ

লেখক, ব্লগার, সাংবাদিক

রাজনৈতিক বিশ্লেষক

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version