বাংলাদেশে বিএনপি সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জঘন্যতম অবনতি ঘটছে, তা নিয়ে দেশজুড়ে উদ্বেগ, আতঙ্ক ও ক্ষোভ ক্রমশ বাড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সরকারের প্রথম ১০০ দিনেই দেশে ২৪৯টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। নিরপেক্ষ সূত্রে এই সংখ্যা আরো বেশি। শুধু তাই নয়, মাসভিত্তিক হিসাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় প্রতিমাসেই হত্যার সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির ১৭-২৮ তারিখ পর্যন্ত সময়ে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা ছিল ১৩। মার্চে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪২-এ। এপ্রিলে আরও বৃদ্ধি পেয়ে হয় ৮৩, আর মে মাসে পৌঁছে যায় ভয়াবহ ৯৮-এ। অর্থাৎ মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে হত্যাকাণ্ডের হার কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভয়াবহ দুর্বলতার ইঙ্গিত বহন করে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি অনেককেই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে ২০০১-২০০৬ সালের বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়কার সহিংসতা, সন্ত্রাস ও রাজনৈতিক অস্থিরতার দিনগুলোকে। সেই সময় দেশজুড়ে বাংলা ভাই, জঙ্গিবাদ, সিরিজ বোমা হামলা, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, চাঁদাবাজি এবং সংখ্যালঘু নির্যাতনের অসংখ্য অভিযোগ আন্তর্জাতিক মহলেও আলোচিত হয়েছিল।
বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সেই সময়ের নানা ঘটনার মিল খুঁজে পাচ্ছেন অনেক পর্যবেক্ষক। নাগরিক সমাজের অভিযোগ, অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে সরকারের দৃশ্যমান ব্যর্থতা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে। খুন, ছিনতাই, ডাকাতি, অপহরণ ও চাঁদাবাজির ঘটনা প্রায় প্রতিদিনই সংবাদ শিরোনাম হচ্ছে। রাজধানী থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলা পর্যন্ত সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। সমালোচকরা বলছেন, রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো নাগরিকের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু হত্যাকাণ্ডের এমন ঊর্ধ্বমুখী গ্রাফ প্রমাণ করে যে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। বরং অপরাধীরা অনেক ক্ষেত্রেই বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
সুশীল সমাজের একটি অংশ মনে করছে, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর আধিপত্য, এবং অপরাধ দমনে সমন্বয়হীনতার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। ফলে জনগণের মধ্যে বিচারহীনতার সংস্কৃতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হয়, তাহলে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে। হত্যাকাণ্ডের ক্রমবর্ধমান এই প্রবণতা শুধু জননিরাপত্তার জন্যই নয়, বরং দেশের সামাজিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্যও বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। দেশবাসীর প্রত্যাশা, সরকার রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে এসে বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করবে এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে দল-মত নির্বিশেষে কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। অন্যথায়, ২০০১-০৬ সালের অস্থির ও সহিংস সময়ের স্মৃতি আবারও বাংলাদেশের বাস্তবতায় ফিরে আসার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।


