বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে আবেগঘন, উত্তেজনাপূর্ণ এবং মর্যাদার লড়াইগুলোর একটি হলো ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার দ্বৈরথ। দুই লাতিন আমেরিকান পরাশক্তির এই চিরন্তন প্রতিদ্বন্দ্বিতা কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর হৃদয়ে আলাদা জায়গা করে নিয়েছে। ২০২৬ বিশ্বকাপেও সেই বহুল প্রতীক্ষিত মহারণের সম্ভাবনা জোরালো হয়ে উঠেছে, যা ফুটবল বিশ্বের জন্য হতে পারে এক অসাধারণ উপহার।
নিজ নিজ গ্রুপে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখিয়ে নকআউট পর্ব নিশ্চিত করেছে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা। গ্রুপ ‘জে’র চ্যাম্পিয়ন হিসেবে শেষ ৩২-এ জায়গা করে নিয়েছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। অন্যদিকে গ্রুপ ‘সি’-তে শীর্ষস্থান অর্জন করে নকআউট পর্বে উঠেছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। টুর্নামেন্টের বর্তমান সূচি অনুযায়ী দুই দল রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন অংশে। ফলে সবকিছু ঠিকঠাক চললে সেমিফাইনালের মঞ্চেই দেখা হতে পারে ফুটবলের দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর।
বিশ্বকাপের মঞ্চে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার শেষ মুখোমুখি লড়াই হয়েছিল ১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপের শেষ ষোলো পর্বে। সেই ম্যাচে ক্লদিও ক্যানিজিয়ার একমাত্র গোলে জয় পেয়েছিল আর্জেন্টিনা। এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ ৩৬ বছর। অবশেষে আবারও বিশ্বকাপে দুই দলের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে।
গ্রুপপর্বে দুর্দান্ত ছন্দে রয়েছে লিওনেল স্কালোনির আর্জেন্টিনা। প্রথম ম্যাচে আলজেরিয়াকে ৩-০ গোলে এবং দ্বিতীয় ম্যাচে অস্ট্রিয়াকে ২-০ গোলে পরাজিত করে আগেভাগেই নকআউট নিশ্চিত করে আলবিসেলেস্তেরা। আক্রমণভাগের ধারালো ফুটবল, মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ এবং রক্ষণভাগের দৃঢ়তায় টুর্নামেন্টের অন্যতম শক্তিশালী দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে তারা। শেষ ৩২-এ তাদের প্রতিপক্ষ হবে গ্রুপ ‘এইচ’-এর রানার্সআপ দল।
অন্যদিকে ব্রাজিলের যাত্রা শুরু হয়েছিল কিছুটা হোঁচট খেয়ে। মরক্কোর বিপক্ষে ১-১ গোলের ড্র দিয়ে অভিযান শুরু করলেও পরে নিজেদের আসল রূপে ফিরে আসে সেলেসাওরা। হাইতি ও স্কটল্যান্ডকে টানা দুটি ম্যাচে ৩-০ গোলের ব্যবধানে হারিয়ে গ্রুপসেরা হয়ে নকআউট নিশ্চিত করে কার্লো আনচেলত্তির দল। আক্রমণাত্মক ফুটবল এবং দারুণ দলগত সমন্বয়ে ব্রাজিলও নিজেদের শিরোপা দাবিদার হিসেবে তুলে ধরেছে। শেষ ৩২-এ তাদের প্রতিপক্ষ হতে পারে নেদারল্যান্ডস, সুইডেন কিংবা জাপানের মধ্যে কোনো একটি দল।
তবে স্বপ্নের সেই ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা লড়াই দেখতে হলে দুই দলকেই পেরোতে হবে কঠিন নকআউট পথ। শেষ ৩২, শেষ ১৬ এবং কোয়ার্টার ফাইনালের বাধা অতিক্রম করতে পারলেই কেবল সেমিফাইনালে মুখোমুখি হবে দুই ফুটবল মহাশক্তি।
ইতিহাসও বলছে, এই লড়াইয়ের উত্তেজনা অন্য যেকোনো ম্যাচের চেয়ে আলাদা। এখন পর্যন্ত ১০৬টি অফিসিয়াল ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা। এর মধ্যে আর্জেন্টিনা জয় পেয়েছে ৪১টিতে, ব্রাজিল জিতেছে ৩৯টিতে এবং ২৬টি ম্যাচ ড্র হয়েছে। পরিসংখ্যানের বিচারে সামান্য এগিয়ে থাকলেও মাঠের লড়াইয়ে কখনোই কোনো দলকে স্পষ্ট ফেভারিট বলা যায় না।
ফুটবলপ্রেমীরা এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন সেই সম্ভাব্য মহারণের জন্য। যদি দুই দল নিজেদের নকআউট বাধা সফলভাবে অতিক্রম করতে পারে, তাহলে ৩৬ বছর পর বিশ্বকাপের মঞ্চে আবারও দেখা যাবে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা ব্রাজিল বনাম আর্জেন্টিনা। আর সেই ম্যাচ নিঃসন্দেহে হয়ে উঠতে পারে ২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত ও স্মরণীয় লড়াই।


