জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের প্রায় পাঁচ দশক পর আত্মস্বীকৃত খুনি শরিফুল হক ডালিমের একটি সাক্ষাৎকারকে ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের পটভূমি। দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকা ডালিমের এই সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা, তৎকালীন সামরিক কর্মকর্তাদের ভূমিকা এবং তাঁর নিজের ভাষ্য অনুযায়ী জিয়াউর রহমানের সঙ্গে কথিত যোগাযোগের নানা দাবি।

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত পাকিস্তানি ইউটিউবার ইলিয়াস হোসেন ২০২৫ সালের ৫ জানুয়ারি ডালিমের সাক্ষাৎকার নেন। পরবর্তী সময়ে সাক্ষাৎকারটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

সাক্ষাৎকারে ডালিম দাবি করেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পরিকল্পনা স্বাধীনতার পরপর নয়; বরং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়েই করা হয়েছিল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তখনকার একটি সামরিক গোষ্ঠীর মধ্যে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রাজনৈতিক গতিপথ নিয়ে পরিকল্পনা তৈরি হয় এবং সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই শেখ মুজিবকে ক্ষমতাচ্যুত করার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল।

‘২৫ বছরের পরিকল্পনা’ ও জিয়াউর রহমানকে নিয়ে দাবি

সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে আলোচিত অংশগুলোর একটি জিয়াউর রহমানকে ঘিরে। ডালিম জানান, পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্মরত থাকার সময় থেকেই তাঁর সঙ্গে জিয়াউর রহমানের পরিচয় ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতার কাছাকাছি কল্যাণী এলাকায় জিয়ার সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি।

ডালিমের ভাষ্য, ওই সাক্ষাতে তিনি জিয়াউর রহমানকে তাঁদের কথিত ‘২৫ বছরের পরিকল্পনা’র কথা জানান এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তাঁর সম্পৃক্ততার বিষয়ে জানতে চান। ডালিম দাবি করেন, জিয়াউর রহমান ওই পরিকল্পনার সঙ্গে কাজ করতে সম্মতি দিয়েছিলেন। এমনকি দুজন কোরআন ছুঁয়ে একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার করেছিলেন বলেও দাবি করেন ডালিম। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ওই পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ক্ষমতাচ্যুত করা।

১৫ আগস্ট কি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ফল?

ডালিমের সাম্প্রতিক বক্তব্য এসব ব্যাখ্যার বিপরীতে একটি ভিন্ন দাবি সামনে এনেছে। তার ভাষ্য সত্য হলে ১৫ আগস্টকে কেবল ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখার পরিবর্তে এর পেছনে আরও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছিল কি না, সেই প্রশ্ন নতুন করে সামনে আসে।

১৯৬৯ সালেই কি মুজিবকে হত্যার আশঙ্কা ছিল?

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার ষড়যন্ত্রের আলোচনা ১৯৭৫ সালের অনেক আগেও ছিল এমন তথ্য বিভিন্ন নথিতে পাওয়া যায়। মিজানুর রহমান খানের মুজিব হত্যাকাণ্ড: মার্কিন দলিলে গ্রন্থে উদ্ধৃত ১৯৬৯ সালের ২৯ ডিসেম্বর ঢাকায় অবস্থিত মার্কিন কনসুলেট থেকে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরে পাঠানো একটি বার্তায় শেখ মুজিবকে হত্যার সম্ভাব্য ষড়যন্ত্রের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

ওই নথিতে বলা হয়, শেখ মুজিব নিজে বিশ্বাস করতেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি ক্ষুদ্র পাঞ্জাবি গোষ্ঠী তাঁকে হত্যার পরিকল্পনা করছে এবং সম্ভাব্য একজন আততায়ী ইতোমধ্যে পূর্ব পাকিস্তানে পৌঁছেছে।

এর অর্থ, ১৯৭৫ সালের হত্যাকাণ্ডের বহু বছর আগে থেকেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে হত্যার আশঙ্কা রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনায় ছিল। তবে ১৯৬৯ সালের ওই আশঙ্কা এবং ১৯৭৫ সালের হত্যাকাণ্ডের মধ্যে সরাসরি সাংগঠনিক যোগসূত্র ছিল কি না, সেটি পৃথকভাবে ঐতিহাসিকভাবে যাচাইয়ের বিষয়।

ডালিমের স্ত্রীকে ঘিরে প্রচলিত কাহিনিতেও ভিন্ন দাবি

সাক্ষাৎকারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ডালিমের স্ত্রীকে ঘিরে দীর্ঘদিনের প্রচলিত একটি বর্ণনা। একটি বহুল প্রচলিত কাহিনিতে বলা হয়, শেখ কামাল ডালিমের স্ত্রীকে অপহরণ করেছিলেন এবং ওই ঘটনাই পরবর্তী সময়ে ডালিমের ক্ষোভ ও ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের অন্যতম কারণ হয়ে ওঠে। সাক্ষাৎকারে ডালিম ভিন্ন বর্ণনা দেন। তার দাবি, ঢাকার লেডিস ক্লাবে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে তার শ্যালক বাপ্পির লম্বা চুল নিয়ে কয়েকজনের সঙ্গে বিরোধের সূত্রপাত হয়। পরে তৎকালীন ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক গাজী গোলাম মোস্তফা সেখানে গিয়ে ডালিমকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। ডালিমের স্ত্রী ও খালা বাধা দিলে তাদেরও গাড়িতে তুলে নেওয়া হয় বলে দাবি করেন তিনি। তবে বঙ্গবন্ধুর পুত্র শেখ কামালের এখানে কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

ডালিমের ভাষ্য অনুযায়ী, পরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হস্তক্ষেপে ওই ঘটনার মীমাংসা হয়। ফলে শেখ কামালের বিরুদ্ধে ডালিমের স্ত্রীকে অপহরণের যে প্রচলিত মিথ্যা বর্ণনা রয়েছে, তাঁর সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারের বক্তব্য তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ব্যাপারটি পুরোপুরি মিথ্যা।

দীর্ঘ নীরবতার পর ডালিমের বক্তব্য

১৯৭৫ সালের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে অবস্থান করা ডালিম এই সাক্ষাৎকারে বহু বছর পর প্রকাশ্যে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তার বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়।

তবে একজন আত্মস্বীকৃত অংশগ্রহণকারীর বক্তব্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক উপাদান হতে পারে, তেমনি তাঁর নিজের ভূমিকা ও স্বার্থের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা জরুরি। ফলে সাক্ষাৎকারে করা দাবিগুলোকে চূড়ান্ত ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে গ্রহণ না করে সংশ্লিষ্ট নথি, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য এবং অন্যান্য স্বাধীন উৎসের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।

নতুন করে সামনে পুরোনো প্রশ্ন

ডালিমের সাক্ষাৎকার ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড নিয়ে কয়েকটি পুরোনো প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে। ১৯৭১ সালেই কি শেখ মুজিবকে ক্ষমতাচ্যুত বা হত্যার কোনো পরিকল্পনা তৈরি হয়েছিল? সেই পরিকল্পনায় কারা যুক্ত ছিলেন? তৎকালীন সামরিক কর্মকর্তাদের ভূমিকা কী ছিল? আর ডালিমের সঙ্গে শেখ কামালের বিরোধ এবং তাঁর স্ত্রীকে ঘিরে প্রচলিত কাহিনির ঐতিহাসিক ভিত্তিই বা কতটা শক্ত?

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version