গাজীপুর, দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পাঞ্চল ও রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্পের প্রাণকেন্দ্র। একসময় যেখানে ভোরের আলো ফোটার আগেই লাখো শ্রমিকের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠত সড়ক, সেখানে এখন অনেক কারখানার ফটকে ঝুলছে বন্ধের নোটিশ। উৎপাদনের শব্দ থেমে গেছে, নিভে যাচ্ছে শিল্পের বাতি। আর এর সঙ্গে সঙ্গে অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে হাজারো শ্রমিক পরিবার।
শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের অর্থনীতি ও শিল্প খাতে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা এখন প্রকট আকারে দৃশ্যমান। বিএনপি সমর্থিত অর্থনৈতিক নীতি এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের শিল্প ও বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা, বাজারে আস্থার সংকট, গ্যাস-বিদ্যুৎ ঘাটতি এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে দেশের শিল্পখাত কঠিন সংকটের মুখে পড়েছে। এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হচ্ছেন শ্রমিকরা।
গত এক সপ্তাহেই গাজীপুরে অন্তত ১৩টি পোশাক ও শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এসব কারখানায় কর্মরত হাজার হাজার শ্রমিক হঠাৎ করেই বেকার হয়ে পড়েছেন। অনেকের ঘরে এখন নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ চালানোই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সর্বশেষ গাজীপুর মহানগরের জরুণ এলাকায় অবস্থিত ইসলাম গার্মেন্টস লিমিটেড (ইউনিট-২) অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। কারখানার শ্রমিক রুবিনা বেগম অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করার পর শ্রমিকদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কায় কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এর ১৩(১) ধারা অনুযায়ী কারখানাটি বন্ধ করে দেয়। এর ফলে এক ঝটকায় প্রায় আড়াই হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েন।
এর আগে বাঘের বাজার এলাকায় লিথী গ্রুপের পাঁচটি শিল্প ইউনিট একযোগে বন্ধ ঘোষণা করা হয়। প্রতিষ্ঠানগুলোর নোটিশে দীর্ঘদিন গ্যাস সংযোগ না থাকা, ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া, ব্যাংক ঋণ প্রাপ্তিতে জটিলতা, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি এবং ধারাবাহিক শ্রমিক অসন্তোষকে দায়ী করা হয়েছে। বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো হলো অ্যাপারেল-২১ লিমিটেড, ফমকম ফ্যাশন লিমিটেড, ফমকম ডাইং লিমিটেড, ফমকম প্রিন্টিং লিমিটেড এবং ফমকম নিটিং লিমিটেড।
অন্যদিকে বোর্ডবাজার এলাকার ইউনিক ডিজাইনার্স ও ইউনিক ওয়াশিং লিমিটেড স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রায় ১ হাজার ৮০০ শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। বহু শ্রমিক এখন বকেয়া বেতন, সার্ভিস বেনিফিট এবং ভবিষ্যৎ জীবিকা নিয়ে গভীর উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন।
কালিয়াকৈরের চন্দ্রা এলাকায় একই দিনে এপেক্স গ্রুপের চারটি কারখানায় তালা ঝুলে যায়। এপেক্স স্পিনিং অ্যান্ড নিটিং মিলস, এপেক্স টেক্সটাইল প্রিন্টিং মিলস, এপেক্স লন্ড্রি মিলস এবং এপেক্স ইয়ার্ন ডাইং মিলস শ্রমিক অসন্তোষ ও উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ তুলে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
এছাড়া কড্ডা-নাওজোড় এলাকার ফ্যাশন লিংকার্স লিমিটেড এবং কাশিমপুরের কোরটেক্স অ্যাপারেলস লিমিটেডও সম্প্রতি বন্ধের তালিকায় যুক্ত হয়েছে।
রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে, তা এখন শিল্প খাতে বড় সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ব্যর্থতা, শিল্পবান্ধব নীতির অভাব, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার এবং রপ্তানি খাতে প্রয়োজনীয় সহায়তা না পাওয়ার কারণে বহু প্রতিষ্ঠান টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে। ফলে একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে শ্রমবাজারে অস্থিরতা বাড়ছে।
শ্রমিক নেতাদের অভিযোগ, অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছরের কাছাকাছি সময় পার হলেও শিল্পখাত পুনরুদ্ধারে কার্যকর কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বরং বিনিয়োগ কমেছে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি থমকে গেছে এবং বিদ্যমান কারখানাগুলোও টিকে থাকার লড়াই করছে।
গাজীপুর কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপ-মহাপরিদর্শক প্রকৌশলী এম. এম. মামুন-অর-রশিদ আশা প্রকাশ করে বলেছেন, বন্ধ কারখানাগুলো ভবিষ্যতে আবার উৎপাদনে ফিরতে পারে। তবে বাস্তবতা হলো, প্রতিটি বন্ধ কারখানার সঙ্গে হাজারো শ্রমিক পরিবারের স্বপ্নও আপাতত থমকে গেছে।
শিল্পনগরী গাজীপুরের বর্তমান পরিস্থিতি স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, দেশের অর্থনীতি ও শিল্প খাতকে স্থিতিশীল করতে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে সংকট আরও গভীর হতে পারে। আর সেই সংকটের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে সাধারণ শ্রমিক ও নিম্ন আয়ের মানুষদের।


