দীর্ঘ ছয় বছরেরও বেশি সময় বন্ধ থাকার পর আবারও চালু হলো ভারত ও চীনের সরাসরি সীমান্ত বাণিজ্য। কোভিড-১৯ মহামারি এবং সীমান্তে উত্তেজনার কারণে স্থগিত থাকা এই ঐতিহাসিক বাণিজ্য শনিবার থেকে পূর্ব সিকিমের নাথুলা পাস এবং উত্তরাখণ্ডের লিপুলেখ পাস দিয়ে পুনরায় শুরু হয়েছে। এই সিদ্ধান্তকে দুই এশীয় প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, সীমান্ত বাণিজ্য পুনরায় চালু হওয়ায় পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও দৃঢ় হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

দুই দেশের মধ্যে হওয়া সমঝোতা অনুযায়ী, প্রতি বছর মে থেকে নভেম্বর পর্যন্ত মোট ছয় মাস সীমান্ত বাণিজ্য চালু থাকবে। সপ্তাহের সোমবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত নির্ধারিত ৩৬টি পণ্যের কেনাবেচা করা যাবে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে সীমান্তবর্তী অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা যেমন উপকৃত হবেন, তেমনি স্থানীয় অর্থনীতিতেও নতুন গতি আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

চুক্তি অনুযায়ী ভারত থেকে হস্তশিল্প, তাঁতের পণ্য, কম্বল, কৃষি সরঞ্জাম, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, শুকনো সবজি, মসলা, তৈরি পোশাক এবং বিভিন্ন গৃহস্থালি সামগ্রী রপ্তানি করা হবে। অন্যদিকে, চীনের তিব্বত অঞ্চল থেকে তৈরি পোশাক, জুতা, ইয়াকের চামড়াজাত পণ্য, মাখন, ছাগল এবং লেপ আমদানি করা হবে। ফলে উভয় দেশের ব্যবসায়ীরা নতুন করে বাণিজ্যিক সুযোগ লাভ করবেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আগে প্রায় ৪০০ ব্যবসায়ীকে সীমান্ত বাণিজ্যের জন্য অনুমতি দেওয়া হলেও বর্তমানে নিরাপত্তা যাচাই শেষে আপাতত ৫৮টি পারমিট দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসন ও স্টেট ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চের অনুমোদন সাপেক্ষে ভবিষ্যতে এই সংখ্যা আরও বাড়ানো হবে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত সীমান্ত চেকপোস্টগুলো সংস্কার করা হয়েছে এবং আধুনিক বাণিজ্যিক অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে, যাতে বাণিজ্য কার্যক্রম নির্বিঘ্নে পরিচালনা করা যায়।

নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভারতের পক্ষ থেকে সীমান্ত এলাকায় অতিরিক্ত ইন্দো-টিবেটান বর্ডার পুলিশ (আইটিবিপি) মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি, বাণিজ্য ব্যবস্থাপনায় সহায়তার জন্য প্রথমবারের মতো নারী জওয়ানদের একটি বিশেষ দলও দায়িত্ব পালন করছে, যা সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

উল্লেখ্য, ১৯৬২ সালের ভারত-চীন যুদ্ধের পর প্রায় ৪৪ বছর এই সীমান্তপথ বন্ধ ছিল। পরে ২০০৬ সালে নাথুলা পাস পুনরায় চালু হলেও ২০২০ সালে কোভিড-১৯ মহামারি এবং সীমান্ত উত্তেজনার কারণে আবারও বাণিজ্য স্থগিত করা হয়। অবশেষে দীর্ঘ বিরতির পর এই বাণিজ্য পুনরায় চালু হওয়ায় দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়ন এবং পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে।

সীমান্ত বাণিজ্য পুনরায় চালু হওয়া শুধু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পুনরারম্ভ নয়, বরং ভারত ও চীনের মধ্যে সংলাপ, পারস্পরিক বিশ্বাস এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীল সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করছে। যদি এই সহযোগিতার ধারা অব্যাহত থাকে, তবে ভবিষ্যতে দুই দেশের বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও আঞ্চলিক সহযোগিতা আরও বিস্তৃত হবে এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version