ঢাকার ধামরাই উপজেলার কুশুরা বাজার থেকে ধানতারা বাজার পর্যন্ত প্রায় ৮ কিলোমিটার সড়ক প্রশস্তকরণ ও সংস্কার প্রকল্পে ভয়াবহ অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পের কাজ অসমাপ্ত রেখেই দুই বছরের বেশি সময় ধরে লাপাত্তা রয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এরই মধ্যে ৭৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে প্রায় সাড়ে ৬ কোটি টাকা বিল উত্তোলন করা হয়েছে। অথচ স্থানীয়দের দাবি, বাস্তবে ৪০ শতাংশ কাজও শেষ হয়নি। ফলে দীর্ঘদিন ধরে ভাঙাচোরা ও ঝুঁকিপূর্ণ সড়কে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন কুশুরা, যাদবপুর, বাইশাকান্দা ও বালিয়া ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষ।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, উপজেলা ও ইউনিয়ন সড়ক প্রশস্ত ও শক্তিশালীকরণ প্রকল্পের আওতায় কুশুরা বাজার থেকে ধানতারা বাজার পর্যন্ত প্রায় ৮ কিলোমিটার সড়ক সংস্কার ও প্রশস্তকরণের জন্য ১৪ কোটি ৮৬ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। দরপত্রের মাধ্যমে কাজটি পায় ধামরাইয়ের মেসার্স ইসমাইল হোসেন নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ২০২২ সালের ডিসেম্বর মাসে কাজ শুরু হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের অগ্রগতি ছিল অত্যন্ত ধীর।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত মাত্র দুই কিলোমিটার সড়কে পিচঢালাই এবং আরও প্রায় দেড় কিলোমিটার অংশে ইটের খোয়া ফেলা হয়। এরপর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ঠিকাদার ও তাঁর লোকজন কাজ ফেলে চলে যান। সেই থেকে প্রকল্পের বাকি অংশে আর কোনো কাজ হয়নি।
চুক্তি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে দুই বছরেরও বেশি সময় অতিবাহিত হলেও প্রকল্পটি এখনও অর্ধসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে আছে। এলজিইডি একাধিকবার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দিলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, অসমাপ্ত প্রকল্পের বিপরীতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ৭৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে প্রায় ৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা বিল তুলে নিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বাস্তবে ৪০ শতাংশের বেশি কাজই হয়নি। উপজেলা প্রকৌশলীর ভাষ্যও বলছে, সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ কাজ হয়ে থাকতে পারে।
শুক্রবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দেড় কিলোমিটার অংশে বিছানো ইটের খোয়া ভেঙে ধুলায় পরিণত হয়েছে। ধুলার কারণে পথচারী ও মোটরসাইকেল আরোহীরা প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে চলাচল করছেন। অনেক স্থানে বড় বড় গর্ত তৈরি হওয়ায় যানবাহন চলাচল অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও ব্রেক করলেই গাড়ির চাকা পিছলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
স্থানীয়রা জানান, আগে সড়কটি পাকা থাকলেও সংস্কারের নামে পুরোনো পিচ তুলে ফেলে রেখে দেওয়া হয়েছে। ফলে যেটুকু ভালো রাস্তা ছিল, সেটিও এখন চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল খালেক বলেন, “সংস্কার কাজ শুরুর আগে অন্তত কোনোভাবে চলাচল করা যেত। এখন রাস্তার অবস্থা এতটাই খারাপ যে প্রতিদিনই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। রোগী নিয়ে হাসপাতালে যেতে কিংবা কৃষিপণ্য বাজারে নিতে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। দ্রুত কাজ শেষ করতে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।”
এ বিষয়ে ধামরাই উপজেলা প্রকৌশলী মিশুক কুমার দত্ত বলেন, তিনি সম্প্রতি এ দপ্তরে যোগ দিয়েছেন। যোগদানের আগেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ৭৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে সাড়ে ৬ কোটি টাকা উত্তোলন করেছে। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না করায় ঠিকাদারকে ১৪ লাখ ৮৬ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে এবং সেই অর্থ আদায়ও করা হয়েছে। পাশাপাশি ঠিকাদারের চুক্তি বাতিল করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, অবশিষ্ট কাজ দ্রুত শেষ করতে নতুন করে দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়া চলছে। নতুন ঠিকাদার নিয়োগের মাধ্যমে প্রকল্পটি সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এদিকে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কটির কাজ বন্ধ থাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। তাদের অভিযোগ, সরকারি অর্থ ব্যয়ের পরও কাজ অসমাপ্ত রেখে ঠিকাদারের বিল উত্তোলনের ঘটনায় জবাবদিহি ও সুষ্ঠু তদন্ত প্রয়োজন। একই সঙ্গে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দ্রুত সড়কটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন করার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।


