সম্পাদকীয় কলাম
বাংলাদেশের ইতিহাসে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ ঘটে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্ট। সপরিবারে নির্মমভাবে নিহত হন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭৫-এর পরের সময়টি শুধু ক্ষমতার পালাবদলের ইতিহাস নয়; এটি রাষ্ট্রের ভেতরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, সামরিক অভ্যুত্থান, পাল্টা অভ্যুত্থান এবং বিচারব্যবস্থার ওপর সামরিক নিয়ন্ত্রণের এক ভয়াবহ অধ্যায়। সেই অধ্যায়ের সবচেয়ে অন্ধকার অংশগুলো জড়িয়ে আছে জিয়াউর রহমানের কুখ্যাত শাসনামলের সঙ্গে।
১৯৭৬ থেকে ১৯৮১- এই সময়কে শুধু জিয়ার মত একজন সামরিক শাসকের ক্ষমতায় থাকার সময় হিসেবে দেখলে ইতিহাসের একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। বিশেষ করে ১৯৭৬ সালে কর্নেল আবু তাহেরের মৃত্যুদণ্ড এবং ১৯৭৭ সালের অভ্যুত্থান-পরবর্তী ব্যাপক সামরিক বিচার ও মৃত্যুদণ্ড বাংলাদেশের সামরিক ইতিহাসে আজও গভীর প্রশ্নের জন্ম দেয়।
কর্নেল তাহের: যে বিচারকে আদালতই অবৈধ বলেছিল
কর্নেল আবু তাহের ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের বীর যোদ্ধা ও সেক্টর কমান্ডার। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের পাল্টা অভ্যুত্থানে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং তখন বন্দী জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করার ঘটনাতেও তাঁর ভূমিকা ছিল। কিন্তু ক্ষমতার সমীকরণ বদলে যাওয়ার পর তাহেরই হয়ে ওঠেন জিয়ার অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী। জিয়ার প্রথম বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হন মহান স্বাধীনতায় পা হারানো কর্ণেল তাহের।
১৯৭৬ সালের জুলাইয়ে সামরিক ট্রাইব্যুনালে তাহেরের কথিত বিচার হয় এবং ২১ জুলাই তাঁকে ফাঁসি দেওয়া হয়। পরবর্তীতে হাইকোর্ট সেই বিচারকে অবৈধ ঘোষণা করে এবং পর্যবেক্ষণ দেয় যে তাহেরের মৃত্যুদণ্ড ছিল পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের সমতুল্য; আদালতের পর্যবেক্ষণে জিয়াউর রহমানের পরিকল্পনার কথাও উঠে আসে। জিয়াই কর্ণেল তাহেরের খুনী হিসেবে সর্বজনসিদ্ধ হয়। অর্থাৎ প্রশ্নটি শুধু তাহেরকে কেন মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল তা নয়। গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, একজন মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডারের বিচার স্বাধীন ও ন্যায়সংগত ছাড়াই কেবল কতৃত্বিবাদী জিয়ার ইচ্ছায় ঘটেছিল, যা নির্মম হত্যাকাণ্ডগুলোর একটি।
১৯৭৭: সামরিক বাহিনীর ভেতর রক্তের বন্যা
১৯৭৭ সালের ২ অক্টোবর বিমানবাহিনী ও সেনাবাহিনীর কিছু সদস্যের বিদ্রোহের পর পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। বিদ্রোহ দমন করার পর ব্যাপক ধরপাকড় শুরু হয় এবং বিশেষ সামরিক ট্রাইব্যুনালে বহু সেনাসদস্য ও বিমানসেনার বিচার করা হয়। সরকারি ও বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের সংখ্যা নিয়ে পার্থক্য রয়েছে। ১৯৮৮ সালে প্রকাশিত বিমানবাহিনীর সরকারি ইতিহাসে জিয়ার নির্দেশে ৫৬১ জন বিমানসেনাকে ফাঁসি দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। অন্যদিকে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় ১৯৭৭ সালের অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে জিয়ার নির্দেশে ১,১০০ থেকে ১,৪০০-এর বেশি সামরিক সদস্যের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কথা বলা হয়েছে; একটি বহুল উদ্ধৃত সরকারি হিসাব হিসেবে ১,১৪৩ জনের সংখ্যাও উল্লেখ করা হয়। সংখ্যার এই পার্থক্যই প্রমাণ করে, ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ নথি আজও ইতিহাসের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সবচেয়ে ভয়াবহ অভিযোগ বিচারপ্রক্রিয়ার গতি ও পদ্ধতি নিয়ে। বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে, অভিযুক্তদের দলবদ্ধভাবে সামরিক ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হতো এবং মৃত্যুদণ্ডের পর অতি দ্রুত তা কার্যকর করা হতো। ফলে প্রশ্ন ওঠে এগুলো কি প্রকৃত অর্থে বিচার ছিল, নাকি বিদ্রোহ দমনের নামে একটি ভয়াবহ প্রতিশোধমূলক অভিযান? জিয়া রক্তহাতে খুনের সাম্রাজ্য সেসময় গড়ে তোলে।
রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা বনাম রাষ্ট্রীয় প্রতিশোধ
কেউ কেউ বলতে পারেন, ১৯৭৭ সালে সামরিক বাহিনীর মধ্যে বিদ্রোহ হয়েছিল, অফিসার হত্যা হয়েছিল, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছিল। সুতরাং সরকারকে কঠোর ব্যবস্থা নিতেই হতো। কিন্তু রাষ্ট্রের হাতে অস্ত্র থাকার অর্থ রাষ্ট্রের হাতে সীমাহীন ক্ষমতা থাকা নয়। বিদ্রোহ দমন করা এক বিষয়, আর বিদ্রোহের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তিকে দ্রুত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া আরেক বিষয়। একটি সভ্য রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য হলো অভিযুক্ত ব্যক্তি যত বড় অপরাধেই অভিযুক্ত হোক, তারও আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার থাকে। সেখানেই ১৯৭৭-এর ঘটনাগুলো সবচেয়ে বড় প্রশ্নের মুখে পড়ে। কারণ সামরিক শৃঙ্খলা রক্ষার নামে যদি বিচারপ্রক্রিয়াই সংকুচিত হয়ে যায়, তাহলে রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা আর ন্যায়বিচারের মধ্যে পার্থক্য থাকে না।
খালেদ মোশাররফের হত্যাও এই ধারার অংশ
১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করেছিলেন। ৭ নভেম্বরের পাল্টা অভ্যুত্থানের সময় খালেদ মোশাররফ, কর্নেল খন্দকার নাজমুল হুদা ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল এ টি এম হায়দার নিহত হন। এঁরা প্রত্যেকেই মহান মুক্তিযুদ্ধের অকুতোভয় দুঃসাহসী মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। এই হত্যাকাণ্ড সরাসরি জিয়াউর রহমানের নির্দেশে হয়েছিল এমন দাবি ইতিহাসে আছেন। তাই ইতিহাসকে রাজনৈতিক স্লোগানে নামিয়ে না এনে প্রশ্নটি করা জরুরিঃ ৭ নভেম্বরের ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসে কারা লাভবান হয়েছিল এবং সেই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত দায় কার ওপর ছিল? একইভাবে কর্নেল তাহেরের মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রে আদালতের পরবর্তী পর্যবেক্ষণ জিয়াউর রহমানের ভূমিকা নিয়ে যে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে, সেটিকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
হারিয়ে যাওয়া লাশের গল্প
ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মম দিকটি সংখ্যার মধ্যে নয়; সংখ্যার পেছনে থাকা মানুষগুলোর মধ্যে। একজন সৈনিকের মৃত্যুদণ্ড মানে শুধু একটি সামরিক পদ বা একটি নামের সমাপ্তি নয়। তার সঙ্গে একটি পরিবারও ভেঙে পড়ে, একজন মা তাঁর সন্তানকে হারান, একজন স্ত্রী তাঁর স্বামীকে হারান, একটি শিশু তার বাবাকে হারায়। আর যদি পরিবারের হাতে প্রিয়জনের শেষ দেখা, কবর কিংবা মৃত্যুর পূর্ণাঙ্গ তথ্যও না থাকে, তবে সেই শোক কখনো সম্পূর্ণ হয় না। ১৯৭৭-এর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ও নিখোঁজ সামরিক সদস্যদের পরিবারগুলোর দীর্ঘদিনের অভিযোগ তাই বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক দলিল। এই অধ্যায়ের পূর্ণ সত্য জানতে হলে শুধু কতজনকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল সেই হিসাব নয়, কতজন গ্রেপ্তার হয়েছিল, কার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ ছিল, কার বিচার কোথায় হয়েছিল, মৃত্যুদণ্ডের নথি কোথায়, মরদেহ কোথায় দাফন করা হয়েছিল সবকিছুর রাষ্ট্রীয় আর্কাইভ উন্মুক্ত করা প্রয়োজন।
জিয়ার উত্তরাধিকার: খুন, খুন আর খুন
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে বাংলাদেশে প্রবল আলোচনা আছে। তাকে সামরিক শাসক এবং রাজনৈতিক-সামরিক দমননীতির সঙ্গে যুক্ত করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সেনা এবং রাষ্ট্রের মধ্যে গণহত্যার সূচনাকারী হিসেবেই প্রাজ্ঞ করা যায়।
যে রাষ্ট্রে সামরিক অভ্যুত্থান ছিল ক্ষমতার প্রধান ভাষা, সেখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল রাষ্ট্র কি আইন দিয়ে চলবে, নাকি বন্দুক দিয়ে? কর্ণেল তাহেরের অপ-বিচার, ১৯৭৭-এর সামরিক ট্রাইব্যুনাল এবং ব্যাপক মৃত্যুদণ্ড সেই প্রশ্নকে আরও তীব্র করে তোলে।
আজ বহু দশক পর দাঁড়িয়ে হয়তো সেই সময়ের প্রতিটি মৃত্যুর দায় নির্ধারণ করা সহজ নয়। কিন্তু ইতিহাসের দায় হলো প্রশ্ন করা। কার নির্দেশে গ্রেপ্তার হয়েছিল মানুষগুলো? কোন আইনে বিচার হয়েছিল? কতজনের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ ছিল? কতজন আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পেয়েছিল? কতজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল? কত পরিবারের কাছে আজও তাদের স্বজনের শেষ ঠিকানা অজানা?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া ১৯৭৫ থেকে ১৯৮১-এর বাংলাদেশের ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। এই প্রশ্নমালার উত্তর খুঁজতে গিয়ে জিয়াকে রাজনৈতিক জিঘাংসক এবং সামরিক খুনী হিসেবে অকপটে অভিধা করা যায়।
রাষ্ট্রের সবচেয়ে ভয়ংকর অপক্ষমতা হলো কাউকে হত্যা করার ক্ষমতা নয়; হত্যার পর তার অস্তিত্বকেও নথি থেকে মুছে দেওয়ার ক্ষমতা। জিয়ার আমলের সামরিক দমন-পীড়নের ইতিহাস তাই শুধু আওয়ামী লীগ-বিএনপি বা কোনো রাজনৈতিক দলের বিতর্ক নয়। এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা, সামরিক প্রতিষ্ঠান, বিচারব্যবস্থা এবং মানবাধিকারের ইতিহাস। একদিন যদি রাষ্ট্রীয় আর্কাইভ সম্পূর্ণভাবে উন্মুক্ত হয়, যদি নিখোঁজ সৈনিকদের নথি প্রকাশিত হয়, যদি প্রতিটি সামরিক বিচারের কাগজ জনসমক্ষে আসে তাহলেই হয়তো জানা যাবে সেই পাঁচ বছরের অন্ধকারে ঠিক কতজন মানুষ হারিয়ে গিয়েছিলেন জিয়ার নির্দেশে খুন হয়ে।
ইতিহাস কাউকে চিরকাল আড়াল করে রাখে না। সময়ের আদালতে বন্দুকের ক্ষমতা শেষ হয়ে যায়, কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়। আর সেই প্রশ্নই একদিন রাষ্ট্রকে তার অতীতের মুখোমুখি দাঁড় করায়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাতাবরণ খুললেই জিয়ার রক্তাক্ত জিহবা খাপড়ে ওঠে আর লোমহর্ষক সব খুনের সাম্রাজ্য দেখে রীতিমতো আঁতকে উঠতে হয়।
আদিত্য প্রতাপ ঘোষ
লেখক, ব্লগার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক


