বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, কথিত ছাত্র আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান, দুই দেশের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক টানাপোড়েন এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়ে মন্তব্য করেছেন সাবেক ভারতীয় হাইকমিশনার রিভা গাঙ্গুলি দাস। সম্প্রতি ডয়চে ভেলেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বর্তমান পরিস্থিতি, পারস্পরিক আস্থার সংকট এবং শেখ হাসিনাকে ঘিরে দিল্লি-ঢাকার অবস্থান নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেন।
শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান প্রসঙ্গে রিভা গাঙ্গুলি বলেন, ভারতে আসার কিছুক্ষণ আগেও শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তিনি ভারতে এসেছেন একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। ফলে তাকে ‘পালিয়ে আসা’ হিসেবে বর্ণনা করা সঠিক নয় বলেও তার বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
সাবেক এই কূটনীতিক বলেন, আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। তার মতে, গত ১৫ বছরে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও প্রবৃদ্ধিতেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।
শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক সংবাদ সম্মেলনের প্রসঙ্গ টেনে রিভা গাঙ্গুলি বলেন, ওই সংবাদ সম্মেলন ভারত সরকারের কোনো উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়নি। সাউথ এশিয়ান ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবের আমন্ত্রণে শেখ হাসিনা নিজ সিদ্ধান্তে সেখানে বক্তব্য দিয়েছেন।
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে সম্প্রতি পাঠানো প্রেস রিলিজ ও কূটনৈতিক চিঠির ভাষা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন রিভা গাঙ্গুলি। তার দাবি, ওই বার্তাকে প্রচলিত অর্থে কূটনৈতিক চিঠি হিসেবে বিবেচনা করা কঠিন। এর ভাষা বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে একটি অস্বস্তিকর রাজনৈতিক অবস্থানে ফেলেছে এবং কূটনৈতিক শিষ্টাচারের সঙ্গেও তা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো বা এক্সট্রাডিশন প্রসঙ্গে রিভা গাঙ্গুলি বলেন, প্রত্যর্পণ একটি অত্যন্ত জটিল আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া; এটি কোনো সরল বা তাৎক্ষণিক বিষয় নয়। তবে শেখ হাসিনা নিজে বাংলাদেশে ফিরতে চাইলে তাকে ভারতে আটকে রাখার আইনি সুযোগ কতটা রয়েছে, সেটিও পরিস্থিতি ও সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে বলে তিনি ইঙ্গিত দেন।
তার মতে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হতে পারে তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন ভারতের সাবেক এই হাইকমিশনার। তিনি বলেন, দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটের জন্য সবসময় ভারতকে দায়ী করার প্রবণতা থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। নিজেদের মধ্যে প্রতিহিংসার রাজনীতি বন্ধ করে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার দিকে মনোযোগ দেওয়া জরুরি।
রিভা গাঙ্গুলির মতে, বর্তমানে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ‘আস্থার সংকট’। রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও পারস্পরিক সন্দেহের কারণে দুই দেশের সম্পর্কের ওপর চাপ তৈরি হলেও সাধারণ মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ, বাণিজ্য, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহযোগিতাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের পারস্পরিক নির্ভরতা এখনো গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি মনে করেন, অতীতের ভুল বোঝাবুঝি ও রাজনৈতিক উত্তেজনা কাটিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতকে নিজেদের স্বার্থেই সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে এগোতে হবে। প্রতিবেশী দুই দেশের দীর্ঘদিনের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত যোগাযোগ বিবেচনায় নিয়ে পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠনই হতে পারে ভবিষ্যৎ সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।


