নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে ভিসা বাতিলের দাবি- পুনর্বিবেচনার অনুরোধ বাংলাদেশের; দেশে আটকা পড়ে ব্যবসা-জীবিকা হারানোর শঙ্কা
সংযুক্ত আরব আমিরাতে প্রায় ৪ হাজার ৮০০ বাংলাদেশির ভিসা বাতিলের ঘটনায় চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন প্রবাসীরা। চলতি বছরের জুলাই থেকে বিভিন্ন ইস্যুতে ভিসা বাতিলের ঘটনা ঘটছে বলে জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর। হঠাৎ ভিসা বাতিলের কারণে অনেকেই দেশে এসে আর আমিরাতে ফিরতে পারছেন না। এতে তাঁদের ব্যবসা, চাকরি, পরিবার ও ভবিষ্যৎ জীবিকা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, আমিরাতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে বাংলাদেশিদের ভিসা বাতিল করা হচ্ছে। তবে ঠিক কী কারণে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের ভিসা বাতিল করা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা এখনো স্পষ্ট নয়। বিষয়টি পুনর্বিবেচনা এবং ভিসা বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনরায় যাচাইয়ের জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ।
নুরুল হক নুর বলেন, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে তিনি জানতে পেরেছেন, ভিসা বাতিল হওয়া বাংলাদেশির সংখ্যা বর্তমানে প্রায় ৪ হাজার ৮০০-তে পৌঁছেছে। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের জায়গা থেকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রথমেই জানতে চাওয়া হয়েছে, কী কারণে এসব ভিসা বাতিল করা হচ্ছে এবং এভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া কতটা যুক্তিসংগত।
তিনি জানান, যাঁদের ভিসা বাতিল হয়েছে, তাঁদের বিষয়গুলো পুনরায় যাচাই-বাছাই করার জন্যও আমিরাত সরকারের কাছে অনুরোধ জানানো হয়েছে। সংকট নিরসনে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তিনি।
ভুক্তভোগী প্রবাসীদের ভাষ্য, জুলাই মাস থেকে অনেকের ভিসা কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাচ্ছে। কারও ই-মেইলে, কারও মোবাইল ফোনে, আবার কারও নিয়োগকর্তা বা সংশ্লিষ্ট কফিলের কাছে এ-সংক্রান্ত বার্তা পাঠানো হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন ছুটিতে দেশে আসা প্রবাসীরা। আমিরাতে ফেরার প্রস্তুতি নেওয়ার সময় ভিসা বাতিলের খবর পেয়ে তাঁরা আটকে পড়ছেন দেশে। অনেকেরই ফেরার টিকিট, ব্যবসায়িক পরিকল্পনা ও পারিবারিক দায়িত্ব হঠাৎ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছে।
এক ভুক্তভোগী প্রবাসী জানান, তাঁর বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা গ্রেপ্তারিসংক্রান্ত অভিযোগ নেই। আমিরাতে তাঁর ব্যবসা ও পরিবার রয়েছে। নিয়মিত জীবনযাপন করলেও হঠাৎ ভিসা বাতিলের কারণে তিনি দেশে এসে বিপাকে পড়েছেন।
তিনি বলেন, আমিরাতে ফিরতে না পারলে ব্যবসা পরিচালনা, পরিবারের ভরণপোষণ এবং দীর্ঘদিনের গড়ে তোলা জীবিকা- সবকিছুই হুমকির মুখে পড়বে। তাঁর মতো আরও অনেক প্রবাসী একই ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন বলে দাবি করেন তিনি।
সংযুক্ত আরব আমিরাত বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার। দেশটিতে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী ও ব্যবসায়ী বসবাস করেন। ফলে একসঙ্গে কয়েক হাজার বাংলাদেশির ভিসা বাতিলের ঘটনায় প্রবাসীদের মধ্যে আতঙ্কের পাশাপাশি দেশের অভিবাসন খাতেও নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ভিসা বাতিলের প্রকৃত কারণ, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের শ্রেণিবিন্যাস এবং পুনর্বিবেচনার সুযোগ সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য প্রকাশ করা জরুরি। একই সঙ্গে যাঁদের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের অভিযোগ নেই, তাঁদের বিষয়টি মানবিক ও ন্যায়সংগতভাবে পর্যালোচনার জন্য কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করা প্রয়োজন।
সেন্টার ফর এনআরবির চেয়ারপারসন এম এস শেকিল চৌধুরী মনে করেন, এ পরিস্থিতির সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিরও সম্পর্ক থাকতে পারে। তাঁর মতে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদার করার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে দায়িত্ব পালন করা বাংলাদেশি নাগরিকদের যোগাযোগ, অভিজ্ঞতা ও নেটওয়ার্ককেও কাজে লাগানো যেতে পারে। তিনি সংকট সমাধানে সরকারের সমন্বিত কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন।
এদিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিসা বাতিল হওয়া বাংলাদেশিদের বিস্তারিত তথ্য আবুধাবিতে বাংলাদেশ দূতাবাসের নির্ধারিত ই-মেইল ঠিকানায় জানানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। ভুক্তভোগীদের ভিসা বাতিলের বার্তা, পাসপোর্টের তথ্য, যোগাযোগের নম্বর এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সংরক্ষণ করে দূতাবাসে পাঠানোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
প্রবাসীদের প্রত্যাশা, বাংলাদেশ সরকার দ্রুত আমিরাত কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কার্যকর আলোচনা করে ভিসা বাতিলের কারণ স্পষ্ট করবে এবং প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের ভিসা পুনর্বিবেচনার ব্যবস্থা করবে। অন্যথায় এই সংকট দীর্ঘায়িত হলে হাজারো বাংলাদেশি প্রবাসীর কর্মসংস্থান, ব্যবসা ও পারিবারিক নিরাপত্তা আরও বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।


