বাংলাদেশে চিকিৎসকের পরিচয় ব্যবহার করে রোগী দেখানোর নামে প্রতারণার অভিযোগ নতুন নয়। ভুয়া এমবিবিএস সনদ, জাল নিবন্ধন এবং চিকিৎসকের পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন স্থানে রোগী দেখানোর একাধিক ঘটনা ইতোমধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে সামনে এসেছে।
দেশে প্রায় ১০ হাজার ভুয়া এমবিবিএস চিকিৎসক রয়েছেন। তাদের অনেকেই বিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনা কিংবা উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডিও পেরোননি।
তবে ভুয়া চিকিৎসক ও জাল এমবিবিএস সনদের অস্তিত্ব যে বাস্তব, বিভিন্ন সময়ের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান ও তদন্তে তার প্রমাণ মিলেছে। ২০২২ সালে ঢাকার মালিবাগে গোয়েন্দা পুলিশ একটি চক্রের ছয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশের দাবি ছিল, ওই চক্র দীর্ঘদিন ধরে ভুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে এমবিবিএসসহ বিভিন্ন বিষয়ের জাল সনদ বিক্রি করছিল। তাদের কাছ থেকে ভুয়া এমবিবিএস সনদ ব্যবহারকারী কয়েকজনকেও গ্রেপ্তার করা হয়।
এর আগে ২০২০ সালে দুদক বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) এক কর্মকর্তা ও আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা করে। অভিযোগ ছিল, জাল এমবিবিএস সনদ ব্যবহারকারী ১২ জনকে চিকিৎসক হিসেবে নিবন্ধন দেওয়া হয়েছিল। তদন্তে তাদের কয়েকজনের বিদেশি মেডিকেল ডিগ্রির সনদ ভুয়া বলে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় নিশ্চিত করেছিল।
শুধু জাল সনদ নয়, প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও চিকিৎসক পরিচয়ে রোগী দেখার ঘটনাও বিভিন্ন সময়ে ধরা পড়েছে। ২০২১ সালে বরিশালের গৌরনদীতে এইচএসসি পাস এক ব্যক্তি নিজেকে চিকিৎসক পরিচয় দিয়ে রোগী দেখানোর অভিযোগে এক বছরের কারাদণ্ড ও জরিমানার মুখে পড়েন।
সাম্প্রতিক সময়েও এমন ঘটনা থেমে নেই। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে রাজশাহীতে এইচএসসি পাস এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে নিজেকে এমবিবিএস, এমসিপিএস ও এফসিপিএসধারী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পরিচয়ে চিকিৎসা দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হলে ভ্রাম্যমাণ আদালত তাকে ছয় মাসের কারাদণ্ড ও জরিমানা করেন। সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল মালিককেও জরিমানা করা হয়।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরিচয় ব্যবহার করে এসব ব্যক্তি রোগীর কাছ থেকে ফি নেওয়ার পাশাপাশি ভুল চিকিৎসা, ভুল ওষুধ কিংবা অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার ঝুঁকি তৈরি করতে পারেন। সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো- জটিল রোগের ক্ষেত্রে ভুল চিকিৎসা রোগীর জীবন পর্যন্ত বিপন্ন করতে পারে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক অভিযানে ভুয়া চিকিৎসকদের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ফার্মেসির বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ২০২০ সালে গাইবান্ধায় ভুয়া চিকিৎসকের পাশাপাশি সাতটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে জরিমানা করা হয়েছিল।
ভুয়া চিকিৎসক শনাক্তে শুধু কাগজের সনদ দেখাই যথেষ্ট নয়। চিকিৎসকের শিক্ষাগত যোগ্যতা, নিবন্ধন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন যাচাই করা জরুরি। ২০২২ সালে ভুয়া সনদ চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে পুলিশও জনগণকে চিকিৎসকের বিএমডিসি নিবন্ধন নম্বর যাচাইয়ের পরামর্শ দিয়েছিল।
ফলে ‘ডাক্তার’ পরিচয়ে কেউ রোগী দেখলেই তার যোগ্যতা নিয়ে নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ নেই। জাল সনদ, ভুয়া পরিচয় ও নিবন্ধনবিহীন চিকিৎসার বিরুদ্ধে নিয়মিত নজরদারি এবং কঠোর ব্যবস্থা না হলে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যনিরাপত্তা আরও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।


