‘ফুল ফান্ডেড’ বৃত্তির প্রতিশ্রুতি, অফার লেটারে শুধু টিউশন-আবাসন!
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়াতে পাকিস্তানের ঘোষিত ‘পাকিস্তান-বাংলাদেশ নলেজ করিডোর’ এখন প্রশ্নের মুখে। ‘ফুললি ফান্ডেড’ বা সম্পূর্ণ অর্থায়িত বৃত্তির প্রতিশ্রুতি দিয়ে আবেদন ও বাছাই প্রক্রিয়া শেষ করার পর মাস্টার্সে নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের দেওয়া অফার লেটারে সেই প্রতিশ্রুত সুবিধার পুরোটা না থাকার অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, অফার লেটারে মূলত টিউশন ফি মওকুফ ও আবাসন সুবিধা রাখা হলেও খাবার, মাসিক ভাতা, যাতায়াত, বিমানভাড়া, চিকিৎসা বিমাসহ অন্যান্য খরচের সুবিধা রাখা হয়নি।
২০২৫ সালের আগস্টে পাকিস্তানের তৎকালীন ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের ঢাকা সফরের সময় ‘পাকিস্তান-বাংলাদেশ নলেজ করিডোর’ চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়। পাকিস্তানের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এর আওতায় পাঁচ বছরে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য ৫০০টি বৃত্তি দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়। একই উদ্যোগের অংশ হিসেবে বাংলাদেশি সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও রাখার কথা বলা হয়েছিল।
পাকিস্তানের উচ্চশিক্ষা কমিশন-এইচইসি- এই বৃত্তি কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। সরকারি ঘোষণায় উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ২০২৬ সালের মে মাসে পাকিস্তানের সরকারি সূত্র জানায়, প্রথম ধাপে ৭৪ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী পাকিস্তানের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করেছেন।
এইচইসির প্রকাশিত বৃত্তি-তথ্যে বৃত্তির সুবিধার মধ্যে সম্পূর্ণ টিউশন ফি, মাসিক ভাতা, হোস্টেল ও মেস/খাবারের খরচ, এককালীন সেটেলমেন্ট অ্যালাউন্স এবং বিমানভাড়া উল্লেখ রয়েছে। এই কারণে আবেদনকারীদের মধ্যে ‘ফুল ফান্ডেড’ বৃত্তি নিয়ে প্রত্যাশা তৈরি হয়।
কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, দ্বিতীয় ধাপে মাস্টার্সের জন্য নির্বাচিত হওয়ার পর শিক্ষার্থীদের যে অফার লেটার দেওয়া হয়েছে, সেখানে আগের ঘোষণার সঙ্গে সুবিধার বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।
কয়েকজন শিক্ষার্থীর বক্তব্য অনুযায়ী, দীর্ঘ আবেদন, পরীক্ষা ও বাছাই প্রক্রিয়া শেষে তারা যখন ভর্তি হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন জানতে পারেন- তাদের জন্য ১০০ শতাংশ টিউশন ফি মওকুফ এবং আবাসন সুবিধা দেওয়া হবে। কিন্তু মাসিক জীবনযাত্রার ভাতা, খাবারের খরচ, যাতায়াত, বিমানভাড়া, চিকিৎসা বিমা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয়ের বিষয়ে সুবিধা নেই।
আশরাফুল ইসলাম রুম্মন নামে এক শিক্ষার্থী জানান, তিনি পাকিস্তানের হারিপুরের পিএএফ-আইএএসটিতে মাস্টার্সের জন্য অফার লেটার পেয়েছেন। তার দাবি, অফার লেটারে টিউশন ফি ও আবাসন খরচ বহনের কথা থাকলেও জীবনযাত্রার ব্যয়, পরিবহন, ভিসা ফি, চিকিৎসা বিমা এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ বাদ দেওয়া হয়েছে।
আরেক শিক্ষার্থী আবু মুসার অভিযোগ, তাঁর ক্ষেত্রেও টিউশন ফি ও আবাসনের সুবিধা থাকলেও মাসিক ভাতা, খাবার, স্বাস্থ্যবিমা কিংবা বিমানভাড়ার সুবিধা রাখা হয়নি। একই সঙ্গে তিনি যে বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রোগ্রামের জন্য আবেদন করেছিলেন, সেটির পরিবর্তে অন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগও করেছেন।
শিক্ষার্থীদের বক্তব্য, আবেদন করার শুরু থেকেই বৃত্তিটিকে সম্পূর্ণ অর্থায়িত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। সেই অনুযায়ী তারা পরীক্ষা দিয়েছেন, বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করেছেন এবং নির্বাচিত হওয়ার পর বিদেশে পড়াশোনার প্রস্তুতিও নিয়েছেন।
কিন্তু শেষ পর্যায়ে এসে যদি বৃত্তির আর্থিক সুবিধা পরিবর্তিত হয়, তাহলে তাদের জন্য পাকিস্তানে গিয়ে পড়াশোনার ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়বে বলে তারা আশঙ্কা করছেন। বিশেষ করে বিদেশে গিয়ে মাসিক জীবনযাত্রার ব্যয় বহনের মতো পর্যাপ্ত অর্থ না থাকলে শুধু টিউশন ও আবাসন সুবিধা অনেক শিক্ষার্থীর জন্য যথেষ্ট নয়- এমন বক্তব্যও এসেছে।
এদিকে পাকিস্তানের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, নলেজ করিডোরের প্রথম ব্যাচে ৭৪ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ইতোমধ্যে পাকিস্তানের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা শুরু করেছেন। তাদের মধ্যে প্রকৌশল, চিকিৎসাবিজ্ঞান, কম্পিউটার সায়েন্স, সাইবার সিকিউরিটি ও জীববিজ্ঞানসহ বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষার্থীরা রয়েছেন।
২০২৬ সালের মে মাসে পাকিস্তানের এইচইসি ও ২০টি বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশে দ্বিতীয় দফার শিক্ষা মেলার আয়োজন করে। ঢাকা ছাড়াও বরিশাল, রাজশাহী, সিলেট, চট্টগ্রাম ও রংপুরে এসব কার্যক্রম পরিচালিত হয়। সেখানে ৫০০টি ‘ফুলি ফান্ডেড’ আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল স্কলারশিপের সুযোগ তুলে ধরা হয়েছিল।
বিষয়টি জানতে পাকিস্তানের উচ্চশিক্ষা কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ১ সেপ্টেম্বর ই-মেইল করা হলেও ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। ঢাকার পাকিস্তান হাইকমিশনের কাছেও বিষয়টি জানতে চাওয়া হয়। হাইকমিশনের কাউন্সিলর শাবিদ উল্লাহ ওয়াজির জানান, বিষয়টি এইচইসির এখতিয়ারভুক্ত হওয়ায় সেখান থেকে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করা হচ্ছে। পরে আবার যোগাযোগ করা হলেও তখনও কোনো নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছেও জানতে চাওয়া হলেও বিষয়টি তাদের জানা নেই বলে জানানো হয়েছে।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পাকিস্তানের সরকারি ঘোষণায় নলেজ করিডোরের আওতায় ৫০০টি বৃত্তিকে ‘fully funded’ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে এইচইসির বৃত্তি-সংক্রান্ত তথ্যে টিউশন ফি, ভাতা, হোস্টেল-মেস, সেটেলমেন্ট অ্যালাউন্স ও বিমানভাড়ার মতো সুবিধার উল্লেখ রয়েছে।
অন্যদিকে, মাস্টার্সে নির্বাচিত কয়েকজন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর দাবি- তাদের হাতে আসা অফার লেটারে এসব সুবিধার বড় অংশ নেই। ফলে সরকারি ঘোষণা, বৃত্তির প্রচার এবং বাস্তবে দেওয়া অফার লেটারের মধ্যে কোনো পার্থক্য আছে কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।


