আদিত্য প্রতাপ ঘোষের কলাম
নথি নেই, তদন্ত প্রতিবেদন নেই, পলাতক আসামিদের ক্যাম্পাসে ঘোরাফেরা; বিচারের অপেক্ষায় পরিবার
একজন তরুণকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা করা হলো। মামলা হলো। আসামি করা হলো একাধিক ব্যক্তিকে। কয়েকজন গ্রেপ্তারও হল। কিন্তু দুই বছর পেরিয়ে গেলেও শেষ হয়নি তদন্ত। আদালতে জমা পড়েনি তদন্ত প্রতিবেদন। এমনকি নিহত শামীম মোল্লার ভাইয়ের করা পৃথক হত্যা মামলার নথিই এখনো তদন্ত সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) হাতে পৌঁছায়নি বলে সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগ নেতা শামীম মোল্লা হত্যার মামলার এই দীর্ঘসূত্রতা এখন একাধিক প্রশ্ন সামনে এনেছে। তদন্ত শেষ হচ্ছে না কেন? আদালতের নির্দেশের পরও দ্বিতীয় মামলার নথি কোথায় আটকে আছে? আর যাদের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে, তাদের কয়েকজন কীভাবে পলাতক থেকেও ক্যাম্পাসে ঘোরাফেরা করার সুযোগ পাচ্ছেন এমন প্রশ্ন তুলছে নিহতের পরিবার।
২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শামীম মোল্লাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এর আগে ১৫ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবনের সামনে জঙ্গীদের কথিত কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের ওপর হামলায় তার জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছিল। সেই ঘটনার জেরেই তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
শামীম ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী। মৃত্যুর সময় তার বয়স ছিল ৩৩ বছর। দুই মামলা, এক তদন্ত, তবু অগ্রগতি কোথায়?
হত্যাকাণ্ডের দুই দিন পর, ২০ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা সুদীপ্ত শাহীন আশুলিয়া থানায় আট শিক্ষার্থী এবং অজ্ঞাতপরিচয় ২০ থেকে ২৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। পরে মামলাটির তদন্তভার যায় পিবিআইয়ের হাতে।
এরপর ৯ অক্টোবর শামীমের বড় ভাই শাহীন আলম ঢাকার একটি আদালতে পৃথক হত্যা মামলা করেন। ওই মামলায় সুদীপ্ত শাহীন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার গাফরুল হাসান চৌধুরী, প্রক্টর এ কে এম রাশিদুল আলমসহ ১২ জনকে আসামি করা হয়।
দুটি মামলার অভিযোগ ও আসামিদের বিষয়ে আদালত পরবর্তী সময়ে দ্বিতীয় মামলাটি আগের মামলার সঙ্গে একীভূত করার নির্দেশ দেন। কিন্তু এখানেই যেন থেমে আছে প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আদালতের নথি ও সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের করা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন এখনো আদালতে জমা দেয়নি পিবিআই। আর শামীমের ভাইয়ের করা মামলার নথি এখনো পিবিআইয়ের হাতে পৌঁছায়নি।
দুই বছর ধরে চলা একটি হত্যা মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন নেই, আর একই ঘটনায় করা আরেকটি মামলার নথি তদন্ত সংস্থার কাছেই নেই, এই পরিস্থিতিই মামলার তদন্তপ্রক্রিয়া নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।
‘মামলার নথিই যদি খুঁজে না পাওয়া যায়…’
শামীমের বড় ভাই শাহীন আলমের কথায় হতাশা ও ক্ষোভ স্পষ্ট। নিজের করা মামলার অগ্রগতি জানতে তিনি একাধিকবার আদালতে গেছেন। কিন্তু সংশ্লিষ্ট আদালতকর্মীরা তাকে জানিয়েছেন, তার করা মামলার কোনো নথি তাদের কাছে নেই। তাকে পিবিআইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।
পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করেও তিনি জানতে পারেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের করা মামলার নথি তদন্ত সংস্থাটি পেয়েছে। কিন্তু তার করা মামলার নথি এখনো পাওয়া যায়নি। শাহীন আলমের প্রশ্ন, ‘আমার করা মামলার নথিই যদি খুঁজে পাওয়া না যায়, তাহলে ভাই হত্যার ঘটনায় কীভাবে ন্যায়বিচার আশা করতে পারি?’
তিনি আরও অভিযোগ করেন, আসামিদের কয়েকজনের রাজনৈতিক যোগাযোগের কারণে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা রয়েছে। তবে তদন্ত কর্মকর্তা এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
তিনজন জামিনে, পাঁচজন এখনো পলাতক
মামলার নথি অনুযায়ী, শামীম হত্যার ঘটনায় ২০২৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর গাজীপুরের হোতাপাড়া থেকে ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী মাহমুদুল হাসান রায়হানকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ২৯ সেপ্টেম্বর ঢাকার তুরাগ এলাকা থেকে ফার্মেসি বিভাগের শিক্ষার্থী সাইফুল ইসলাম ভূঁইয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। আরেক আসামি আতিকুজ্জামান আদালতে আত্মসমর্পণ করলে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
মামলার নথি অনুযায়ী, এই তিনজনই বর্তমানে জামিনে রয়েছেন। অন্যদিকে আহসান লাবিব, হামিদুল্লাহ সালমান, রাজন মিয়া, রাজু আহমেদ ও সোহাগ মিয়া এখনো পলাতক।
এখানেও রয়েছে আরেক প্রশ্ন। পরিবারের অভিযোগ, পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় তাদের কয়েকজনকে ক্যাম্পাসে প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করতে দেখা গেছে। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রের দাবি, গত বছরের ২১ মার্চ থেকে লাবিব, সালমান, রাজন ও রাজুকে ক্যাম্পাসে দেখা গেছে।
অভিযোগটি সত্য হলে প্রশ্ন উঠছে, একটি হত্যা মামলার পলাতক আসামিরা যদি একই ক্যাম্পাসে প্রকাশ্যে চলাফেরা করেন, তাহলে তাদের গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর উদ্যোগ কোথায়?
রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন
দলীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, পলাতক আসামিদের কয়েকজন বিভিন্ন রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। লাবিব জাতীয় ছাত্রশক্তির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি, সালমান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হল শাখা ছাত্রদলের সভাপতি এবং রাজু ও রাজন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।
নিহতের পরিবারের অভিযোগ, রাজনৈতিক যোগাযোগের কারণে আসামিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে পুলিশ নিষ্ক্রিয় রয়েছে। তবে পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আনিসুর রহমান এ অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন। তার বক্তব্য, তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে যারা এখনো গ্রেপ্তার হয়নি, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
‘তদন্ত চলছে’ কিন্তু শেষ কবে?
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আনিসুর রহমান বলেছেন, তদন্ত কবে শেষ হবে, তা তিনি বলতে পারছেন না। তিনি শুধু জানিয়েছেন, তদন্ত চলছে। ঢাকা জেলা পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার এম এন মোর্শেদও তদন্ত চলমান থাকার কথা জানিয়েছেন। তবে মামলার নথিপত্র না দেখে তিনি বিস্তারিত বলতে পারেননি।
আদালতের নথি অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের করা হত্যা মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের পরবর্তী তারিখ ২৮ সেপ্টেম্বর। কিন্তু প্রশ্ন হলো, দুই বছর ধরে চলা তদন্ত আর কতদিন চলবে?
বিচারের অপেক্ষায় একটি পরিবার
শামীমের মা কোহিনুর বেগমের বয়স ৬৫ বছর। ছেলেকে হারানোর পর দুই বছর কেটে গেছে। কিন্তু তার কাছে সময় যেন থেমে আছে সেই ১৮ সেপ্টেম্বরেই। তিনি বলেছেন, ছেলে হত্যার বিচার না পাওয়া পর্যন্ত তার কষ্টের অবসান হবে না। যারা দায়ী, তাদের বিচারের আওতায় আনা হয়েছে, এটি দেখে যেতে চান তিনি।
শামীমের ভাইয়ের ভাষ্য, হত্যাকাণ্ডের পর থেকে তার মা অনেকটাই নীরব হয়ে গেছেন। দিনের বড় সময় একা থাকেন, ছেলের কথা ভাবেন এবং আগের মতো ঘুমাতেও পারেন না।
একটি পরিবারের জন্য দুই বছর দীর্ঘ সময়। কিন্তু একটি হত্যা মামলার বিচারপ্রক্রিয়ায় দুই বছর পরও যদি তদন্ত শেষ না হয়, মামলার নথি নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকে এবং একাধিক আসামি পলাতক থাকেন, তাহলে সেই বিলম্ব শুধু একটি পরিবারের অপেক্ষাকে দীর্ঘ করে না, বিচারপ্রক্রিয়ার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে।
শামীম হত্যার ঘটনায় কার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ প্রমাণিত হবে, তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অবশ্যই আদালতের। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর প্রথম শর্তই হলো নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত। এখন শামীমের পরিবারের একটাই প্রত্যাশা তদন্ত শেষ হোক, মামলার সব নথি সঠিকভাবে আদালতে পৌঁছাক এবং অভিযোগের সত্যতা অনুযায়ী দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি করা হোক।
আদিত্য প্রতাপ ঘোষ
লেখক, ব্লগার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক


