দেশে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে ভয়াবহ এক চিত্র সামনে এসেছে। একদিকে হাজার হাজার শিশু নিখোঁজ হচ্ছে, অন্যদিকে নির্যাতন ও হত্যার শিকার হচ্ছে একের পর এক শিশু। নিখোঁজের পর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাও বাড়াচ্ছে উদ্বেগ। সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে- শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা আসলে কতটা কার্যকর?
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় জিডি হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ শিশুকে উদ্ধার বা পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হলেও ২ হাজার ৩৮ শিশুর এখনো কোনো সন্ধান মেলেনি। অর্থাৎ নথিভুক্ত নিখোঁজ শিশুদের প্রায় ১৩ শতাংশ এখনো অজ্ঞাত অবস্থায় রয়েছে।
শিশুদের ওপর সহিংসতার আরেকটি ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পর্যবেক্ষণে। সংগঠনটি চলতি বছরের জানুয়ারি-আগস্টের শিশু হত্যা ও সহিংসতার পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে।
আট মাসে ১৫৫ শিশু হত্যার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে শারীরিক নির্যাতনে ৬৮, পারিবারিক পরিসরে নির্যাতনে ৪৯ এবং ধর্ষণের পর ২৬ শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। একই সময়ে নিখোঁজের পর ৩৬ শিশুর মরদেহ উদ্ধারের তথ্যও সামনে এসেছে।
এই পরিসংখ্যান কেবল কিছু বিচ্ছিন্ন অপরাধের হিসাব নয়; এটি শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার সামনে একটি গভীর সংকেত। একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর দ্রুততম সময়ে তাকে খুঁজে বের করা, ঝুঁকি শনাক্ত করা, অপরাধপ্রবণ এলাকায় নজরদারি বাড়ানো এবং নিখোঁজের ঘটনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করার সক্ষমতা নিয়ে এখন কঠিন প্রশ্ন উঠছে।
বিশেষ করে ২ হাজারের বেশি শিশু এখনো নিখোঁজ- এই সংখ্যাই পরিস্থিতির ভয়াবহতা বোঝাতে যথেষ্ট। পুলিশ বলছে, ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের নিখোঁজ হওয়ার পেছনে পারিবারিক বিরোধ, পড়াশোনার চাপ, বন্ধুদের প্রভাবসহ বিভিন্ন কারণ রয়েছে। তবে কারণ যা-ই হোক, প্রতিটি নিখোঁজ শিশুকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা ও রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা ব্যবস্থার ওপরই বর্তায়।
চলতি বছর শিশু নিখোঁজের ঘটনা মোকাবিলায় পুলিশের পক্ষ থেকে ‘মুন অ্যালার্ট’ ব্যবস্থাও চালু করা হয়েছে। নিখোঁজের প্রথম কয়েক ঘণ্টাকে ‘গোল্ডেন টাইম’ হিসেবে বিবেচনা করে দ্রুত উদ্ধার তৎপরতার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু একই সময়ে হাজার হাজার নিখোঁজ এবং দুই হাজারের বেশি শিশুর এখনো সন্ধান না পাওয়ার পরিসংখ্যান সেই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন সামনে আনছে।
সম্প্রতি কুমিল্লায় ১৩ বছরের অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডও শিশু নিরাপত্তার বিষয়টি নতুন করে সামনে এনেছে। নিখোঁজ হওয়ার পর একটি শিশুর মরদেহ উদ্ধার- এ ধরনের প্রতিটি ঘটনা পরিবারকে শুধু শোকাহতই করে না, বরং রাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থা কতটা দ্রুত ঝুঁকি শনাক্ত ও প্রতিরোধ করতে পারছে, সেই প্রশ্নও সামনে আনে।
শিশু হারিয়ে যাবে, পরিবার থানায় ছুটবে, দিনের পর দিন অপেক্ষা করবে- আর কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেই অপেক্ষার শেষ হবে মরদেহ উদ্ধারে; এমন বাস্তবতা কোনোভাবেই স্বাভাবিক হতে পারে না।


