বাংলাদেশে নতুন সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) উদ্বেগজনক হারে কমে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে দেশে নতুন ইক্যুইটি বা প্রকৃত বিদেশি মূলধন বিনিয়োগ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭০ দশমিক ৩৪ শতাংশ কমে মাত্র ৭ কোটি ৮২ লাখ ৬০ হাজার মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে। গত চার প্রান্তিকের মধ্যে এটিই সর্বনিম্ন।
এই পতন শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; বরং এটি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকটের স্পষ্ট প্রতিফলন। তাদের ভাষ্য, নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশকে এখন অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করছে।
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, সামষ্টিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, দুর্বল বিনিয়োগ পরিবেশ, নীতিগত জটিলতা এবং আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থাগুলোর ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশের সার্বভৌম ঋণমান (সোভরেন ক্রেডিট রেটিং) কমিয়ে দেওয়ার ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমেছে। বিনিয়োগের আগে তারা একটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, নীতির ধারাবাহিকতা এবং মুনাফা নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার সক্ষমতাকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকে নতুন ইক্যুইটি বিনিয়োগ ছিল ২৬ কোটি ৩৮ লাখ ৭০ হাজার ডলার। এরপর জুনে তা কমে ৮ কোটি ১৩ লাখ, সেপ্টেম্বরে ১০ কোটি ১১ লাখ ২০ হাজার এবং ডিসেম্বরে ১০ কোটি ৮৩ লাখ ৪০ হাজার ডলারে নেমে আসে। চলতি বছরের মার্চ প্রান্তিকে তা আরও কমে ৭ কোটি ৮২ লাখ ৬০ হাজার ডলারে পৌঁছেছে।
পুনঃবিনিয়োগকৃত লভ্যাংশ এবং আন্তঃকোম্পানি ঋণ মিলিয়ে মোট এফডিআই প্রবাহও কমেছে। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে মোট বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে ৪৪ কোটি ৭৩ লাখ ১০ হাজার ডলার, যেখানে এক বছর আগে একই সময়ে ছিল ৭৯ কোটি ৬৫ লাখ ৭০ হাজার ডলার।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক মো. এজাজুল ইসলাম বলেন, নতুন ইক্যুইটি বিনিয়োগের বড় ধরনের পতন বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতার ইঙ্গিত দেয়। ব্যাংকিং খাতে উচ্চ খেলাপি ঋণ, আর্থিক খাতের দুর্বলতা এবং আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিংয়ের অবনতি বিনিয়োগের জন্য নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের মতে, বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে শুধু প্রণোদনা নয়, দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো উন্নয়ন ও নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করাও জরুরি। অন্যদিকে সিপিডির বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ওয়ান-স্টপ সার্ভিস পুরোপুরি কার্যকর না হওয়া, প্রশাসনিক জটিলতা এবং ব্যবসার উচ্চ ব্যয় এখনো বড় বাধা হয়ে রয়েছে।
বাংলাদেশ স্থানীয় বেসরকারি বিনিয়োগও কমে যাওয়ায় বোঝা যাচ্ছে যে দেশীয় উদ্যোক্তারাও নতুন বিনিয়োগে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন।
এদিকে, ইউনক্টাডের ‘ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টমেন্ট রিপোর্ট ২০২৬’-এ বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি হওয়া সত্ত্বেও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বাংলাদেশ আফ্রিকার ঘানা, উগান্ডা ও কঙ্গোর মতো দেশগুলোর থেকেও পিছিয়ে রয়েছে। এসব দেশ প্রশাসনিক সংস্কার, বিনিয়োগবান্ধব নীতি এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদেশি বিনিয়োগ টানতে সক্ষম হয়েছে।
নতুন বিদেশি বিনিয়োগে এমন বড় ধরনের পতন দেশের অর্থনীতির জন্য সতর্কবার্তা। তারা বলছেন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, নীতিগত স্থিতিশীলতা, আর্থিক খাতের সংস্কার এবং প্রশাসনিক জটিলতা দূর করা না গেলে আগামী দিনেও বিদেশি বিনিয়োগে ইতিবাচক পরিবর্তন আসা কঠিন হবে।


