দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা, জনদুর্ভোগ ও সরকারি ব্যয়ের নানা চাপের মধ্যেই ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার- এমন ঘোষণা দিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে মার্কিন বোয়িং উড়োজাহাজ ব্যবহারের ‘আবদার’ করেছিলেন। সেই প্রেক্ষাপটে ১৪টি বোয়িং কেনার পাশাপাশি আরও কিছু বিমান লিজ নেওয়া এবং ইউরোপীয় নির্মাতা এয়ারবাসের উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনাও করছে সরকার।
সোমবার ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসনের সমন্বয় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী এসব কথা জানান। তাঁর এই বক্তব্যের পর রাষ্ট্রীয় অর্থে এত বড় অঙ্কের উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত কতটা প্রয়োজনীয়, অর্থনৈতিকভাবে কতটা লাভজনক এবং দেশের বর্তমান বাস্তবতায় এর অগ্রাধিকার কতটা যৌক্তিক- এসব প্রশ্ন সামনে এসেছে।
মন্ত্রী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি আবদার ছিল- তাদের বোয়িংগুলো যেন ব্যবহার করা হয়। আমরা সেগুলো কিনছি এবং ব্যবহার করছি। আমরা ১৪টি বোয়িং ক্রয় করছি এবং আরও কিছু বিমান লিজে নেওয়া হবে।’
একই সঙ্গে তিনি জানান, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড ও জার্মানিতে তৈরি এয়ারবাসও কেনা হবে। দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্য বিমান পরিবহন খাতে সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যেই সরকার এসব উদ্যোগ নিচ্ছে বলে জানান তিনি।
তবে সরকারের এই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে- একজন বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানের অনুরোধ কি রাষ্ট্রীয় অর্থে বিপুল পরিমাণ উড়োজাহাজ কেনার যথেষ্ট কারণ হতে পারে? বিমানবহর সম্প্রসারণের প্রয়োজন থাকলেও এর আগে দেশের প্রকৃত চাহিদা, যাত্রীসংখ্যা, রুটভিত্তিক আয়-ব্যয়, উড়োজাহাজের ব্যবহারযোগ্যতা এবং বিনিয়োগ থেকে সম্ভাব্য আর্থিক ফেরত- এসব বিষয় প্রকাশ্যে তুলে ধরা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকারের পক্ষ থেকে বিমান পরিবহন খাতের সক্ষমতা বাড়ানোর যুক্তি দেওয়া হলেও মন্ত্রীর বক্তব্যে ‘ট্রাম্পের আবদার’ প্রসঙ্গটি সামনে আসায় সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়েও রাজনৈতিক ও জনমনে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
রাষ্ট্রীয় অর্থে শত শত কোটি ডলারের সম্ভাব্য বিনিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সম্পর্কের চেয়ে দেশের স্বার্থ, আর্থিক সক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক লাভকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। বিশেষ করে বিমান কেনা, লিজ, রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানি, পাইলট প্রশিক্ষণ ও পরিচালন ব্যয়- সব মিলিয়ে এর আর্থিক দায় দীর্ঘমেয়াদি।
সরকার দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির কথা বললেও বড় অঙ্কের বিমান কেনার সিদ্ধান্তের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবস্থাপনার বিষয়টি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। জনগণের করের অর্থ কিংবা রাষ্ট্রীয় ঋণের মাধ্যমে এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে ভবিষ্যতে তার আর্থিক দায়ও জনগণকেই বহন করতে হবে।
এ কারণে সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনায় বিমান কেনাকে শুধু আধুনিকায়নের প্রতীক হিসেবে দেখলে হবে না; এর বাণিজ্যিক সক্ষমতা ও আর্থিক ফলাফলও জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে।


