‘আইন ও ন্যায্য প্রক্রিয়া লঙ্ঘন করে শিক্ষক শাস্তি দেওয়া হয়েছে’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ১০ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে সিন্ডিকেটের নেওয়া শাস্তিমূলক ব্যবস্থা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি সুশৃঙ্খল, নিরাপদ ও মেধাভিত্তিক একাডেমিক পরিবেশ নিশ্চিত করে শিক্ষার অনুকূল পরিবেশ ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. নিজামুল হক ভূইয়া এবং সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. জিনাত হুদার স্বাক্ষরিত এক প্রতিবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব দাবি জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে শিক্ষক সমিতি দাবি করেছে, সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট একজন অধ্যাপককে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার এবং ছয়জন শিক্ষককে একাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আইন ও দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক ঐতিহ্যের পরিপন্থী।
তাদের বক্তব্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান এবং এটি ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ, ১৯৭৩’ অনুযায়ী পরিচালিত হয়। ওই আইনে কোনো শিক্ষক, কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণের জন্য যথাযথ তদন্ত, তথ্যানুসন্ধান কমিটি ও ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে অভিযোগ নিষ্পত্তির বিধান রয়েছে। এসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ আইনসঙ্গত নয় বলে দাবি করেছে শিক্ষক সমিতি।
বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, গত ২২ জুনের সিন্ডিকেট সভাতেও তিনজন শিক্ষককে একইভাবে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল। অথচ সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের আত্মপক্ষ সমর্থন, অভিযোগের জবাব দেওয়া কিংবা অভিযোগকারীদের মুখোমুখি হয়ে বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ দেওয়া হয়নি।
শিক্ষক সমিতির ভাষ্য, এ ধরনের পদক্ষেপ শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনই নয়, মানবাধিকার, ন্যায়বিচার এবং সমান অধিকারের নীতিরও পরিপন্থী।
প্রতিবাদ বিজ্ঞপ্তিতে শিক্ষক সমিতি অভিযোগ করেছে, পূর্ববর্তী অনির্বাচিত প্রশাসন বিশ্ববিদ্যালয়ে একপাক্ষিক নীতি অনুসরণ করে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ জন শিক্ষককে একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকে বিরত রেখেছিল। বিভিন্ন পরিচয়ে চিহ্নিত করে তাদের সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করা হয়েছে, যা মানসিক ও অর্থনৈতিক নিপীড়নের শামিল বলে দাবি করা হয়।
তাদের অভিযোগ, বর্তমান প্রশাসনও একই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে দুই বছর আগে শাস্তিপ্রাপ্ত একজন শিক্ষককে পুনরায় শাস্তি দিয়ে শাস্তির মাত্রা আরও বাড়িয়েছে।
শিক্ষক সমিতি বলেছে, বিশ্ববিদ্যালয় হলো জ্ঞানচর্চা, গবেষণা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, বহুত্ববাদ ও পরমতসহিষ্ণুতার কেন্দ্র। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভিন্নমত দমনের সংস্কৃতি ভবিষ্যতের জন্য অশুভ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, রাজনৈতিক পরিবর্তন একটি স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। কিন্তু সেই পরিবর্তনের অজুহাতে শিক্ষকদের মধ্যে ভয়, অনিশ্চয়তা ও অনিরাপত্তার পরিবেশ সৃষ্টি করা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ক্ষতিকর।
শাস্তি প্রত্যাহারের আহ্বান
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন অক্ষুণ্ন রাখা, আইনানুগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা এবং দল, মত, ধর্ম ও লিঙ্গ নির্বিশেষে শিক্ষকদের সহাবস্থান বজায় রাখতে অবিলম্বে সব শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে শিক্ষক সমিতি।
এর আগে গত ২৮ জুলাই অনুষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় পৃথক অভিযোগে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাদেকা হালিমসহ তিন শিক্ষককে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। পাশাপাশি চার শিক্ষককে একাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, শ্রেণিকক্ষ ও শ্রেণিকক্ষের বাইরে অশিক্ষকসুলভ আচরণ, নৈতিক স্খলনসহ বিভিন্ন অভিযোগে অধ্যাপক সাদেকা হালিমকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের অভিযোগ ও তথ্যানুসন্ধান কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মো. শফিকুল ইসলাম এবং অধ্যাপক আফরোজা শেলীকেও সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
অন্যদিকে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা পরিপন্থী কর্মকাণ্ড, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সরকারবিরোধী অপপ্রচার এবং নিষিদ্ধ সংগঠনের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগে ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি ও ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক মো. আবদুল মুহিতকে বিভাগের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে সব ধরনের একাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে বিরত রাখা হয়েছে। একই অভিযোগে ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক আবু সারা শামসুর রউফ এবং শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক মো. রফিকুল ইসলাম (রফিক শাহরিয়ার)-এর বিরুদ্ধেও একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এছাড়া, ২০০৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগে কোনো ধরনের অনিয়ম হয়েছে কি না, তা পর্যালোচনা এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা যাচাইয়ে সহ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক আবদুস সালামের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
শিক্ষক সমিতির প্রতিবাদ এবং সিন্ডিকেটের অবস্থানকে ঘিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক শাস্তি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। এখন শিক্ষক সমিতির দাবি এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই নজর সংশ্লিষ্টদের।


