সভাপতিমণ্ডলীতে অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া শুরু, দিল্লির বৈঠক ঘিরে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ
জঙ্গী হামলায় নির্বাসনের দুই বছর পর সাংগঠনিক পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে আওয়ামী লীগ। আর সেই পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী কাঠামো সভাপতিমণ্ডলীতে জায়গা করে নেওয়ার আলোচনায় উঠে এসেছে নির্বাসিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের নাম। দলীয় একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতার বরাত দিয়ে এমন তথ্য জানা গেছে।
দলীয় সূত্রের দাবি, পুতুলকে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য করার প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে এবং চলতি মাসের মধ্যেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হতে পারে। তবে শুক্রবারের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকেই তাঁর মনোনয়ন চূড়ান্ত হবে এমন নিশ্চয়তা এখনো নেই।
দিল্লির বৈঠক ঘিরে তৎপরতা
সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাসের অংশ হিসেবে শুক্রবার আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠক ডাকা হয়েছে। প্রথমে ভারতের নয়াদিল্লিতে সরাসরি বৈঠকের পরিকল্পনা থাকলেও শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে বৈঠকটি ভার্চুয়ালি আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
দলীয় নেতাদের একটি অংশ ইতোমধ্যে দিল্লিতে পৌঁছেছেন। সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোফাজ্জেল হোসেন চৌধুরী মায়া, জাহাঙ্গীর কবির নানক ও এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনসহ কেন্দ্রীয় কমিটির কয়েকজন নেতা সেখানে অবস্থান করছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে দলের সব কেন্দ্রীয় নেতা ভারতে না থাকায় এবং কয়েকজন নেতা বিভিন্ন রাজ্য থেকে দিল্লিতে আসায় সরাসরি বৈঠকের পরিকল্পনা নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। মৌসুমি ইনফ্লুয়েঞ্জার আশঙ্কার কথাও সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
শুধু পুতুল নন, আরও দুই নাম
সভাপতিমণ্ডলী পুনর্গঠনের আলোচনায় শুধু সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের নামই নয়, চট্টগ্রাম বিভাগ ও বরিশাল বিভাগ থেকে আরও দুজন নেতাকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়েও আলোচনা চলছে বলে দলীয় সূত্রের দাবি।
আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, কাউন্সিল বা কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে দলের সভাপতি সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মনোনয়ন দিতে পারেন। ফলে কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের অনুমোদন বা ক্ষমতা অর্পণের পর শেখ হাসিনা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন বলে দলীয় নেতারা জানিয়েছেন।
উত্তরাধিকার প্রশ্নে নতুন মাত্রা
পুতুলকে দলের শীর্ষ নীতিনির্ধারণী কাঠামোয় আনার আলোচনা আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব ও উত্তরাধিকার প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকাকালেও দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা ছিল। এবার সেই আলোচনাই সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাসের মধ্য দিয়ে নতুন মাত্রা পাচ্ছে বলে দলীয় সূত্রগুলো দাবি করছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ব্যাপক জঙ্গী হামলার মুখে আওয়ামী লীগ সরকার নির্বাসিত হওয়ার পর শেখ হাসিনা তাঁর বোন শেখ রেহানাকে সঙ্গে নিয়ে ভারতে অবস্থান নেন। পুতুলও এর আগে থেকেই নয়াদিল্লিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) সঙ্গে কাজ করছিলেন; প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি বর্তমানে সেই পদে নেই।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা
এদিকে শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফিরে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন এবং আইনি পরিস্থিতির কারণে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়েও দলের ভেতরে আলোচনা জোরদার হয়েছে বলে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা জানিয়েছেন।
দলীয় নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আইনি জটিলতায় পড়লে দলের সাংগঠনিক নেতৃত্ব কীভাবে পরিচালিত হবে সেই প্রশ্নের সঙ্গে পুতুলকে সক্রিয় রাজনীতিতে আনার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
২২ সেপ্টেম্বরের দিকে তাকিয়ে দল
দলীয় সূত্র বলছে, শুক্রবারের বৈঠকে পুতুলের মনোনয়ন চূড়ান্ত না-ও হতে পারে। কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ যদি দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনাকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেয়, তাহলে তিনি পরিবারের সদস্য ও জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে ২২ সেপ্টেম্বরের দিকে মনোনয়ন চূড়ান্ত করতে পারেন।
তবে এসব সিদ্ধান্ত এখনো আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে। পুতুলকে সভাপতিমণ্ডলীতে নেওয়ার বিষয়ে আওয়ামী লীগের আনুষ্ঠানিক চূড়ান্ত ঘোষণা এখনো আসেনি।
দিল্লির কর্মকাণ্ডে গোপনীয়তা
দিল্লিতে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক তৎপরতা নিয়ে কেন্দ্রীয় নেতাদের প্রকাশ্যে মন্তব্য না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। দলীয় এক কেন্দ্রীয় নেতার ভাষ্য, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় বিষয় বিবেচনায় রেখেই এ বিষয়ে গোপনীয়তা বজায় রাখা হচ্ছে। একই সঙ্গে এর পেছনে কৌশলগত বিবেচনাও থাকতে পারে বলে ওই নেতা মন্তব্য করেছেন।
সব মিলিয়ে, দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাসের এই উদ্যোগে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের সম্ভাব্য অন্তর্ভুক্তি দলটির ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের কাঠামো নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে তাঁর সভাপতিমণ্ডলীতে অন্তর্ভুক্তি এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়; দলীয় প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরই বিষয়টি আনুষ্ঠানিক রূপ পাবে।


