কলম্বিয়ায় ৭ দশমিক ৪ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ দুর্যোগে নিহতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ২৪০ জনে দাঁড়িয়েছে। এখনো প্রায় ৩ হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধারে মঙ্গলবারও দিন-রাত অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা। তাঁদের ভাষায়, ‘প্রতিটি মিনিটই গুরুত্বপূর্ণ।’
স্থানীয় সময় সোমবার সকাল ৭টা ৩৪ মিনিটে পশ্চিম কলম্বিয়ায় শক্তিশালী ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। এতে দেশটির চলতি শতাব্দীর অন্যতম ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কালি ও পেরেইরা শহর। বহু ভবন পুরোপুরি বা আংশিক ধসে পড়েছে, হাজারো ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় সড়ক যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও জরুরি সেবাও ব্যাহত হয়েছে।
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত শহরগুলোর একটি কালি। সেখানে ভূমিকম্পের প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর মঙ্গলবার ভোরে ধসে পড়া একটি ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে ৩৫ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে জীবিত উদ্ধার করেন দমকলকর্মীরা। উদ্ধার অভিযানের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করে দমকল বিভাগ জানায়, ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো প্রাণের অস্তিত্বের সন্ধান মিলছে। তাই উদ্ধারকাজে কোনো ধরনের সময়ক্ষেপণের সুযোগ নেই।
ভূমিকম্পের পরপরই প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। মাত্র কয়েক দিন আগে প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়া তিনি সোমবার রাতে কালিতে গিয়ে ক্ষয়ক্ষতি পরিদর্শন করেন এবং উদ্ধার কার্যক্রমের খোঁজ নেন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আশপাশের ভালে দেল কাওকা বিভাগে প্রায় ৫ হাজার বাড়ি ধ্বংস হয়েছে। ওই এলাকায় অন্তত ১৮৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
পেরেইরা শহরেও পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ। কালির প্রায় ১৩০ মাইল উত্তরের এই শহরে অন্তত ৫৮টি ভবন ধসে পড়েছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এসব ভবনের কয়েকটিতে অন্তত ৫৩ জন আটকা পড়ে থাকতে পারেন। শহরটিতে অন্তত ১১ জনের নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এখন পর্যন্ত সেখানে ৬৬ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে।
ভয়াবহ এই ভূমিকম্পের পর ধ্বংসস্তূপে স্বজনদের খুঁজতে অসংখ্য মানুষ ছুটে এসেছেন। কোথাও স্বজনদের আহাজারি, কোথাও আবার জীবিত কাউকে উদ্ধারের আশায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন পরিবারের সদস্যরা। উদ্ধারকারীরা অত্যাধুনিক সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষিত দল নিয়ে ধ্বংসস্তূপের প্রতিটি অংশে তল্লাশি চালাচ্ছেন।
কলম্বিয়ার ইতিহাসে ১৯৯৯ সালের পর এটিই সবচেয়ে প্রাণঘাতী ভূমিকম্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ওই বছরের জানুয়ারিতে দেশটির পশ্চিমাঞ্চলের কফি উৎপাদনকারী এলাকায় ৬ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পে এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছিলেন।
এদিকে ভূমিকম্প-পরবর্তী পরিস্থিতিতে লুটপাট ও বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে এক হাজারের বেশি সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। প্রেসিডেন্টের দপ্তর জানিয়েছে, উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তবে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যেও জীবিত মানুষ উদ্ধারের ঘটনা কিছুটা আশার আলো দেখাচ্ছে। ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় পর একজনকে জীবিত উদ্ধারের ঘটনা উদ্ধারকর্মীদের নতুন করে উৎসাহিত করেছে। তাঁদের মতে, ধ্বংসস্তূপের নিচে মানুষের বেঁচে থাকার সামান্য সম্ভাবনাও থাকলে তল্লাশি চালিয়ে যেতে হবে।
উদ্ধারকারী দলের বার্তা একটাই- সময় যতই পেরিয়ে যাক, ধ্বংসস্তূপের নিচে প্রাণের সম্ভাবনা থাকলে অভিযান থামানো যাবে না। কারণ, এই মুহূর্তে প্রতিটি মিনিটই একটি জীবন বাঁচানোর সুযোগ।


