বিদ্যুৎ সংকটে আবারও কদর বেড়েছে হারিয়ে যেতে বসা হাতপাখার
তীব্র গরমের সঙ্গে ঘনঘন লোডশেডিং- বিদ্যুৎনির্ভর জীবনে নেমে এসেছে চরম ভোগান্তি। ঘরে বৈদ্যুতিক পাখা থাকলেও বিদ্যুৎ না থাকলে তা যেন অচল। আর এই পরিস্থিতিতেই আধুনিকতার চাপে হারিয়ে যেতে বসা হাতপাখা ও তালপাতার পাখার কদর আবারও বাড়তে শুরু করেছে। গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে যে পাখা একসময় ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী, বিদ্যুৎ সংকটের কারণে সেটিই এখন অনেকের কাছে স্বস্তির শেষ ভরসা।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ ঘাটতি ও লোডশেডিং নতুন করে জনজীবনে প্রভাব ফেলছে। পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, ১০ সেপ্টেম্বর বিভিন্ন সময়ে বিদ্যুৎ ঘাটতি দুই থেকে সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি ছিল; বিকেল ৩টায় লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৫৫৭ মেগাওয়াট এবং সন্ধ্যা ৭টায় ৩ হাজার ২১ মেগাওয়াট।
এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংকটও বাংলাদেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতির ওপর চাপ বাড়িয়েছে। রয়টার্সের ১৭ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন ও উচ্চমূল্যের কারণেWorked for 38s
লোডশেডিংয়ে ফিরল গ্রামবাংলার পুরোনো ঐতিহ্য
বিদ্যুৎ সংকটে আবারও কদর বেড়েছে হারিয়ে যেতে বসা হাতপাখার
তীব্র গরমের সঙ্গে ঘনঘন লোডশেডিং—বিদ্যুৎনির্ভর জীবনে নেমে এসেছে চরম ভোগান্তি। ঘরে বৈদ্যুতিক পাখা থাকলেও বিদ্যুৎ না থাকলে তা যেন অচল। আর এই পরিস্থিতিতেই আধুনিকতার চাপে হারিয়ে যেতে বসা হাতপাখা ও তালপাতার পাখার কদর আবারও বাড়তে শুরু করেছে। গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে যে পাখা একসময় ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী, বিদ্যুৎ সংকটের কারণে সেটিই এখন অনেকের কাছে স্বস্তির শেষ ভরসা।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ ঘাটতি ও লোডশেডিং নতুন করে জনজীবনে প্রভাব ফেলছে। পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, ১০ সেপ্টেম্বর বিভিন্ন সময়ে বিদ্যুৎ ঘাটতি দুই থেকে সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি ছিল; বিকেল ৩টায় লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৫৫৭ মেগাওয়াট এবং সন্ধ্যা ৭টায় ৩ হাজার ২১ মেগাওয়াট।
এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংকটও বাংলাদেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতির ওপর চাপ বাড়িয়েছে। এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন ও উচ্চমূল্যের কারণে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। দেশের বিদ্যুতের ৪০ শতাংশের বেশি আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার প্রভাব সরাসরি পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে।
লোডশেডিং ও ভ্যাপসা গরমের কারণে বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের কাছে হাতপাখার প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে। নাটোরের গুরুদাসপুরের চাঁচকৈড় বাজার নিয়ে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, তালপাতার হাতপাখার বিক্রি ও কদর বেড়েছে। কারিগররা তালপাতা, বাঁশের কঞ্চি ও সুতা ব্যবহার করে এসব পাখা তৈরি করছেন।
একসময় প্রায় প্রতিটি গ্রামীণ পরিবারেই দেখা যেত তালপাতা, কাপড় কিংবা বাঁশ-বেতের তৈরি হাতপাখা। দুপুরের প্রচণ্ড গরমে উঠানে বসে কিংবা রাতে ঘুমানোর আগে পরিবারের সদস্যরা হাতে পাখা নিয়ে বাতাস করতেন। শিশুদের ঘুম পাড়াতে মা-বাবা কিংবা দাদা-দাদির হাতের পাখার বাতাস ছিল গ্রামীণ জীবনের অতি পরিচিত এক স্মৃতি।
বিদ্যুৎ ও বৈদ্যুতিক পাখার ব্যাপক বিস্তারের পর সেই দৃশ্য ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়। বাজারে আসে টেবিল ফ্যান, সিলিং ফ্যান, রিচার্জেবল ফ্যান ও এসি। ফলে তালপাতার পাখা হয়ে পড়ে প্রায় অব্যবহৃত। কিন্তু বিদ্যুৎ চলে গেলেই আধুনিক প্রযুক্তির সেই সুবিধাগুলো থেমে যায়- তখন কয়েক দশক আগের সেই হাতপাখাই আবার কার্যকর হয়ে ওঠে।
হাতপাখা কেবল গরম নিবারণের একটি সাধারণ উপকরণ নয়; এটি বাংলার লোকজ সংস্কৃতি ও গ্রামীণ জীবনের দীর্ঘ ঐতিহ্যের অংশ। তালপাতা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক উপকরণ দিয়ে তৈরি পাখার ব্যবহার উপমহাদেশে বহু পুরোনো।
বিভিন্ন অঞ্চলে পাখা তৈরিতে তালপাতা, বাঁশ, সুতা, কাপড় ও বেত ব্যবহার করা হয়। কারিগররা তালপাতা সংগ্রহ করে পানিতে ভিজিয়ে নরম করেন, পরে শুকিয়ে প্রয়োজনমতো কেটে আকৃতি দেন। এরপর বাঁশের কঞ্চি ও সুতা দিয়ে বাঁধাই করে হাতল লাগিয়ে তৈরি করা হয় পাখা।
বাংলার সাহিত্য, গান ও লোকসংস্কৃতিতেও হাতপাখার উপস্থিতি রয়েছে। মায়ের হাতের পাখার বাতাস, গরমের দুপুরে উঠানে বসে পাখা করা কিংবা বিদ্যুৎবিহীন রাতে হাতপাখার বাতাসে ঘুমিয়ে পড়ার স্মৃতি বহু বাঙালির শৈশবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
হাতপাখার চাহিদা বাড়ায় কিছু কারিগর ও বিক্রেতার জন্য এটি বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি করেছে। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, এই লোকশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন প্রশিক্ষণ, সহজ ঋণ, কাঁচামালের সহজলভ্যতা এবং বাজারজাতকরণে সহায়তা। তা না হলে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবারও এই শিল্পের চাহিদা কমে যেতে পারে।
অন্যদিকে, চলমান বিদ্যুৎ সংকটের কারণে শুধু ঘরবাড়িই নয়- কারখানা, হাসপাতাল, কৃষি ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বিদ্যুতের আলোয় যে ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছিল, বিদ্যুৎ সংকটই যেন সেটিকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে। একসময় প্রয়োজনের তাগিদে ব্যবহৃত হাতপাখা আজ শুধু গরম থেকে স্বস্তির উপকরণ নয়- এটি হয়ে উঠেছে হারিয়ে যেতে বসা গ্রামবাংলার জীবন ও সংস্কৃতির এক জীবন্ত স্মারক।


