আদিত্য প্রতাপ ঘোষের কলাম
সত্য না মিথ্যা, এখন আর সবকিছু নিয়ে ভাবি না। যা শুনতে ভালো লাগে, অনেক সময় সেটাই শুনতে ইচ্ছে করে। কিন্তু রাজনীতির কিছু বাতায়ন আছে, যা বিশ্বাস করার আগে অন্তত একবার থমকে দাঁড়াতে হয়। কারণ একটি বিশ্বাসও কখনো কখনো একটি দেশের রাজনৈতিক কল্পনাকে বাস্তবতার চেয়ে দ্রুত উত্তপ্ত করে তুলতে পারে।
কলকাতার সাংবাদিক মনোজ দাসের একটি বক্তব্য সেই কারণেই আলোচনার দাবি রাখে। তাঁর কথাগুলো পুরোপুরি বিশ্বাস করিনি, আবার একেবারে অবিশ্বাসও করিনি। খবরটির সত্যতা যাচাই করার ইচ্ছেও হয়নি। কিন্তু বক্তব্যটির রাজনৈতিক তাৎপর্য উপেক্ষা করার মতো নয়। তাঁর দাবি, তারেক রহমান দিল্লি আসতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আসেননি। এর পেছনে রয়েছে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার প্রশ্ন। ভারতে এলে তারেক রহমানকে সেই বিষয়ে আলোচনায় বসতে হতো। আর সেই আলোচনা এড়াতেই তাঁর দিল্লি সফর হয়নি।
আরও বড় দাবি, ডিসেম্বরের মধ্যে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার প্রশ্নটি নতুন মোড় নিতে পারে। তাঁর মতে, বাংলাদেশে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন ঠেকাতে বর্তমান শাসক ও দেশী-বিদেশী উভয় পক্ষেরই স্বার্থ রয়েছে। ভারতও নাকি অনির্দিষ্টকাল তাঁকে বাইরে রাখতে আগ্রহী নয়। এখানেই আসে সবচেয়ে বিস্ফোরক কথাটি। মনোজ দাসের দাবি, ভারত নাকি শেখ হাসিনাকে নিয়ে আবার ‘একাত্তরের রি রান’ করতে পারে। তাঁর সূত্রের দাবি অনুযায়ী, সবকিছু ঠিকঠাক না চললে আওয়ামী লীগের একটি সশস্ত্র বাহিনী একাত্তরের মতই ভারতের সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশের ভেতরে প্রবেশ করবে এবং ভারতীয় বাহিনী তাদের সহায়তা করবে। বাংলাদেশের ওপর বিরাজমান একাত্তরের পরাজিত অপশক্তি জঙ্গীবাহিনীকে পরাজিত করে ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটানো হবে এবং শেখ হাসিনার ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের পথ তৈরি হবে। এমনকি বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর একটি বড় অংশও নাকি সেই বিদ্রোহী বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত হবে!
শুনতে অবিশ্বাস্য। হয়তো অসম্ভবও। কিন্তু রাজনীতিতে ‘অসম্ভব’ শব্দটি ব্যবহারের আগে ইতিহাসের দিকে তাকাতে হয়। ১৯৭১ সালে একটি রাষ্ট্রের ওপর ধাবমান রাজনৈতিক সংকট কীভাবে আন্তর্জাতিক সামরিক সংঘাতে রূপ নিয়েছিল, তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ। তবে ২০২৬ সালের বাংলাদেশ ১৯৭১ সালের বাংলাদেশ নয়। ভূরাজনীতি বদলেছে, রাষ্ট্রব্যবস্থা বদলেছে, সামরিক বাস্তবতা বদলেছে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কাঠামোও বদলেছে। আজ কোনো প্রতিবেশী দেশের সামরিক হস্তক্ষেপের অর্থ কেবল সীমান্ত অতিক্রম করা নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হবে আন্তর্জাতিক আইন, কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া, আঞ্চলিক শক্তির অবস্থান এবং বৈশ্বিক শক্তিগুলোর হিসাব। তাই, ভূ-রাজনৈতিক কাঠামোয় বাংলাদেশের সুরক্ষিত অবস্থান ভারতের নিরাপত্তার সমার্থক।
তবু প্রশ্নটি থেকে যায়। কেন এমন একটি সম্ভাবনার কথা উচ্চারিত হচ্ছে? কারণ শেখ হাসিনার দেশে ফেরার প্রশ্নটি এখন কেবল একজন রাজনৈতিক নেত্রীর ব্যক্তিগত প্রত্যাবর্তনের প্রশ্ন নয়। এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ, আওয়ামী লীগের অস্তিত্ব, বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান, ভারতের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক স্বার্থ এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। আর এখানেই সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গাটি। যদি কোনো রাজনৈতিক সংকটের সমাধান রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার বাইরে খোঁজা হয়, তাহলে সংকটের সমাধান হয় না; সংকটের চরিত্র বদলে যায়।
শেখ হাসিনা ফিরবেন কি ফিরবেন না, আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে ফিরবে কি না, তারেক রহমানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কী, বিএনপি কী করবে, এসব প্রশ্নের শেষ উত্তর দিতে হবে বাংলাদেশের মানুষকেই। আর যদি সত্যিই সামনে কোনো ‘একাত্তর’ আসে, তবে সেটি যেন আরেকটি রক্তাক্ত যুদ্ধ না হয়। বাংলাদেশের প্রয়োজন আরেকটি যুদ্ধ নয়, প্রয়োজন এমন একটি রাজনৈতিক বন্দোবস্ত যেখানে প্রতিশোধের বদলে জবাবদিহি থাকবে, নির্বাসনের বদলে আইনের শাসন থাকবে এবং ক্ষমতা দখলের বদলে জনগণের ভোটই হবে শেষ কথা।
১৯৭১ আমাদের স্বাধীনতা দিয়েছে। ২০২৬ সালের বাংলাদেশকে আরেকটি ১৯৭১ নয়, একটি পরিণত গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ দরকার।
তাই আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, সামনে কি সত্যিই আর একাত্তর? নাকি রাজনৈতিক অন্ধকারের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া আরেকটি বিস্ফোরক কল্পকাহিনি?
ইতিহাসের উত্তর হয়তো সময়ই দেবে।
আদিত্য প্রতাপ ঘোষ
লেখক, ব্লগার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক


