উপকূলীয় লক্ষ্মীপুরের দুর্গম চরাঞ্চলের হাজারো মানুষের জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে ২২ লাখ টাকা ব্যয়ে কেনা হয়েছিল একটি ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্স। কিন্তু চালু থাকার বদলে চালক, রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনা ব্যয়সহ প্রায় অর্ধকোটি টাকা সরকারি অর্থ খরচ হওয়ার পরও গত তিন বছর ধরে সেটি খালের পাশে পরিত্যক্ত পড়ে আছে। ফলে সরকারি অর্থ অপচয়ের পাশাপাশি জীবনরক্ষাকারী এই প্রকল্প থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন চরাঞ্চলের অসহায় মানুষ।
মেঘনা নদীবেষ্টিত রামগতির চর আবদুল্লাহসহ আশপাশের বিচ্ছিন্ন দ্বীপাঞ্চলের প্রসূতি মা ও গুরুতর অসুস্থ রোগীদের দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছে দিতে ২০২২ সালের অক্টোবরে ‘স্বপ্নযাত্রা’ প্রকল্পের আওতায় চালু করা হয় ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্সটি। তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার হোছাইন আকন্দ এর উদ্বোধন করেন এবং উদ্যোগটির জন্য বঙ্গবন্ধু জনপ্রশাসন পদকও লাভ করেন।
কিন্তু উদ্বোধনের কিছুদিন পরই কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এরপর তিন বছর ধরে অ্যাম্বুলেন্সটি খালের পাশে অযত্নে পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, জনসেবার পরিবর্তে এটি রাজনৈতিক কর্মসূচি ও ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা হয়েছে, যা প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
অভিযোগ রয়েছে, ২০২৩ সালের ৩ ডিসেম্বর লক্ষ্মীপুর-২ আসনের নির্বাচনী প্রচারণায় আওয়ামী লীগের প্রার্থীর পক্ষে দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু সালেহ মো. মিন্টু ফরায়েজী এই ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার করেন। একই বছরের ১৮ আগস্ট সাবেক চেয়ারম্যান খালেদ সাইফুল্লাহ রাজনৈতিক সভায় যেতেও এটি ব্যবহার করেন। এছাড়া ২০২৪ সালের জুন মাসে অ্যাম্বুলেন্সে সাধারণ যাত্রী পরিবহনের ঘটনাও স্থানীয়ভাবে আলোচনার জন্ম দেয়।
সাবেক চেয়ারম্যান খালেদ সাইফুল্লাহ দাবি করেন, অ্যাম্বুলেন্সটি পড়ে থাকায় এবং চালকের বেতন চালাতে ভাড়ায় ব্যবহার করা হয়েছিল।
এদিকে চরবাসীর অভিযোগ, জরুরি রোগী হাসপাতালে নিতে এখনো তিন থেকে চার হাজার টাকা দিয়ে নৌকা ভাড়া করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে নদী পার হওয়ার আগেই রোগীর মৃত্যু ঘটে।
চরের বাসিন্দা মো. আজগর হোসেন বলেন,
“সরকারি ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্সটি যদি সচল থাকত, তাহলে অসংখ্য গরিব মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব হতো। এখন এটি শুধু সরকারি অর্থ অপচয়ের নিদর্শন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।”
রামগতি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. কামনাশিস মজুমদারও স্বীকার করেছেন, ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্স বন্ধ থাকায় চরাঞ্চলের জরুরি স্বাস্থ্যসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং এটি দ্রুত চালু করা প্রয়োজন।
জীবন বাঁচানোর উদ্দেশ্যে নেওয়া একটি সরকারি প্রকল্প দীর্ঘদিন অচল পড়ে থাকায় শুধু কয়েক লাখ টাকার সম্পদই নষ্ট হয়নি, বরং ব্যাহত হয়েছে দুর্গম চরাঞ্চলের মানুষের মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা। যথাযথ তদারকি, জবাবদিহি এবং দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে সরকারি অর্থ অপচয়ের পাশাপাশি জনসেবার এমন ব্যর্থতা আরও প্রকট হবে।


