চট্টগ্রামে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে উঠছে। বর্ষা মৌসুমের শেষ ভাগে এসে এডিস মশাবাহিত এই রোগের সংক্রমণ যেন লাগামহীন। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে যেখানে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল তুলনামূলক কম, সেখানে জুন থেকে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি শুরু হয়। জুলাইয়ে সংক্রমণ আরও বাড়ার পর আগস্টে এসে এক মাসেই আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ২০২ জন। সেপ্টেম্বরের শুরুতেও নতুন রোগী শনাক্ত হওয়া অব্যাহত রয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের পরিসংখ্যান বলছে, গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে নতুন করে ৭৮ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। একই সময়ে খালেদা বেগম (৪৭) নামে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর চট্টগ্রামে ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ছয়জনে। মৃতদের মধ্যে তিনজন নারী ও তিনজন পুরুষ।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে চট্টগ্রামে মোট ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ২ হাজার ১৮৬। এর মধ্যে নগরের ৯৩৬ জন, জেলার বিভিন্ন এলাকার ৯৫৫ জন এবং চট্টগ্রামের বাইরে থেকে এসে চিকিৎসা নেওয়া ২৯৫ জন রয়েছেন। আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষ ১ হাজার ১৫১, নারী ৬০২ এবং শিশু ৪৩৩ জন।
বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১৮৭ জন। এ বছর সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৮৪৭ জন এবং বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ৩৩৯ জন।
চট্টগ্রামের ডেঙ্গু পরিস্থিতির ভয়াবহতার সবচেয়ে বড় চিত্র পাওয়া যায় আগস্টের পরিসংখ্যানে। ওই এক মাসেই আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ২০২ জন- অর্থাৎ বছরের মোট আক্রান্তের অর্ধেকেরও বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছেন মাত্র এক মাসে।
এর আগে ১ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে গত ২৪ ঘণ্টায় ৭২ জন আক্রান্ত হওয়ার তথ্য জানানো হয়েছিল। তখন মোট আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২ হাজার ১০৮। পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় আরও ৭৮ জন আক্রান্ত হওয়ায় সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ১৮৬-তে।
বছরের শুরুতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও জুন থেকে সংক্রমণের গতি বদলে যায়। জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পাঁচ মাসে ১৭৬ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। জুনে আক্রান্ত হন ১২২ জন। জুলাইয়ে সংক্রমণ আরও বাড়ে। আর আগস্টে তা রীতিমতো বিস্ফোরণ ঘটায়।
ডেঙ্গুর এই দ্রুত বিস্তারের মধ্যেই নগরের বিভিন্ন এলাকায় মশার উপদ্রব কমেনি। নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনার দাবি থাকলেও বাস্তবে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে কতটা কার্যকর অভিযান চলছে- তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিশেষ করে নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত স্থাপনা, ছাদ, ড্রেন ও বিভিন্ন খোলা জায়গায় জমে থাকা পানি এডিস মশার প্রজননের সুযোগ তৈরি করছে। এসব স্থান নিয়মিত পরিদর্শন, পানি অপসারণ এবং কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয় নিয়েও অভিযোগ রয়েছে।
একদিকে হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে মশার বিস্তার ঠেকাতে মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম দৃশ্যমানভাবে জোরদার না হওয়ায় জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে- সংক্রমণ হাজার ছাড়ানোর পরও কেন আগাম ও সমন্বিত প্রতিরোধব্যবস্থা কার্যকর করা গেল না?
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ শুধু নাগরিক সচেতনতার ওপর ছেড়ে দেওয়ার বিষয় নয়। এডিস মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত ও ধ্বংস, নিয়মিত অভিযান, পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা এবং নগর ব্যবস্থাপনার সঙ্গে স্বাস্থ্য বিভাগের সমন্বিত কার্যক্রম- সবই সরকারি দায়িত্বের অংশ।
নগরবাসীর সচেতনতার প্রয়োজন অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু নাগরিকের ঘাড়ে পুরো দায় চাপিয়ে প্রশাসনিক দুর্বলতা আড়াল করার সুযোগ নেই। সংক্রমণ যখন এক মাসে ১ হাজার ২০০ ছাড়িয়ে যায়, তখন মশক নিধন কার্যক্রমের কার্যকারিতা, অর্থ ব্যয়, মাঠপর্যায়ের নজরদারি এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়- সবকিছুরই জবাবদিহি জরুরি।
স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের পাশাপাশি আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত করে চিকিৎসার আওতায় আনতে হবে। জ্বর হলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান বলেন, ডেঙ্গু মোকাবিলায় সচেতন হওয়া জরুরি। ঘরবাড়ি ও আশপাশে পানি জমতে না দেওয়ার পাশাপাশি প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। সময়মতো চিকিৎসা শুরু হলে ডেঙ্গুতে মৃত্যুঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ডেঙ্গু রোগীদের মশারির ভেতরে রাখা উচিত। তা না হলে রোগীর শরীর থেকে মশার মাধ্যমে অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে।


