চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে জলদস্যুতা। মাত্র ১৮ দিনের ব্যবধানে তিনটি জাহাজে দুঃসাহসিক হামলা চালিয়ে প্রায় ১০ কোটি টাকার জাহাজের সরঞ্জাম ও মূল্যবান মালামাল লুট করেছে জলদস্যুরা। ধারাবাহিক এসব ঘটনায় দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চট্টগ্রাম বন্দরের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি।
সর্বশেষ গত ১৬ জুলাই ভোরে চট্টগ্রাম বন্দরের চার্লি অ্যাঙ্করেজে নোঙর করা সিয়েরা লিওনের পতাকাবাহী ট্যাঙ্কার ‘তাই শুয়েন’-এ হামলা চালায় প্রায় ২০ জন সশস্ত্র জলদস্যু। পাঁচটি কাঠের নৌকায় করে এসে তারা জাহাজে উঠে নাবিকদের ব্যস্ত রেখে নোঙরের দড়ি, ব্যাটারি ও অন্যান্য মূল্যবান সরঞ্জাম লুট করে পালিয়ে যায়। শিপিং এজেন্ট বেন লাইনের মালিক মোশাররফ হোসেন জানান, জাহাজের ক্যাপ্টেন তাৎক্ষণিকভাবে বন্দর নিয়ন্ত্রণ কক্ষে বার্তা পাঠালেও কোস্টগার্ড ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই দস্যুরা পালিয়ে যায়।
এর আগে ২৯ জুন একই বহির্নোঙরে ডায়নামিক শিপ রিসাইক্লিংয়ের আমদানি করা ‘এমভি হাই জু’ জাহাজে ২০ থেকে ২৫ জন সশস্ত্র ডাকাত উঠে নাবিকদের জিম্মি করে প্রায় এক কোটি টাকার যন্ত্রাংশ লুট করে। পরদিন যমুনা শিপ ব্রেকার্সের ‘এমটি আইআরওএস’ জাহাজ থেকেও কয়েক কোটি টাকার সরঞ্জাম চুরি হয়। পরে নৌ পুলিশ রাজধানীর বাংলাবাজার এলাকা থেকে প্রায় দুই কোটি টাকার চোরাই মালামাল উদ্ধার করলেও অধিকাংশ লুট হওয়া পণ্য উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রতিটি ঘটনায় বন্দর কর্তৃপক্ষ ও কোস্টগার্ডকে দ্রুত অবহিত করা হলেও সময়মতো প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়া যায়নি। চট্টগ্রাম চেম্বারের পাঠানো চিঠিতেও এই বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সমুদ্র নিরাপত্তা সংস্থা রিক্যাপের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরে কোনো জলদস্যুতা বা চুরির ঘটনা ঘটেনি। তবে অল্প সময়ের মধ্যে একের পর এক হামলার ঘটনায় শিপিং এজেন্ট, শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর এবং বন্দর ব্যবহারকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, দেশের প্রায় ৯২ শতাংশ আমদানি-রপ্তানি চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে পরিচালিত হয়। বহির্নোঙরের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে জাতীয় অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বাংলাদেশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। পাশাপাশি বিদেশি শিপিং কোম্পানির ঝুঁকি ও বীমা ব্যয় বাড়বে, যার প্রভাব পড়বে আমদানি-রপ্তানি ব্যয়ের ওপর।
এদিকে পরিস্থিতি মোকাবিলায় বন্দর কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশ কোস্টগার্ড যৌথভাবে নতুন নিরাপত্তা কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। বহির্নোঙরে টহল জোরদার, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বৃদ্ধি, অনুমোদিত ওয়াচম্যান নিয়োগ এবং জাহাজ আগমনের তথ্য বাধ্যতামূলকভাবে সরবরাহ নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব রেফায়েত হামীম জানান, বহির্নোঙরে চুরি ও জলদস্যুতা প্রতিরোধে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও কঠোর করা হয়েছে। কোস্টগার্ড নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে এবং ইতোমধ্যে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে বন্দর সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থায়ী ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।


