দেশে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে মহিলা পরিষদের প্রকাশিত সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান। সংগঠনটির তথ্যমতে, চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই ১ হাজার ৩৫ নারী ও মেয়ে শিশু বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ২৫০ জন ধর্ষণের শিকার, ৬৫ জন সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার, ১৮ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে এবং ৫৩ জন ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছেন।
শনিবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় আয়োজিত নাগরিক সংলাপে এসব তথ্য তুলে ধরে মহিলা পরিষদ। প্রকাশিত পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যার হিসাব নয়, বরং দেশের আইনশৃঙ্খলা, সামাজিক মূল্যবোধ এবং নারী-শিশুর নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও নারী বা শিশু ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন কিংবা সহিংসতার শিকার হচ্ছে। কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও অপরাধ কমছে না, বরং অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা বিচারহীনতার সুযোগ পাচ্ছে। ফলে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং সমাজে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে।
অনেকের প্রশ্ন, যদি মাত্র পাঁচ মাসে ২৫০টি ধর্ষণের ঘটনা সামনে আসে, তাহলে অপ্রকাশিত বা মামলা না হওয়া ঘটনার সংখ্যা কত হতে পারে? সামাজিক লজ্জা, ভয় এবং প্রভাবশালীদের চাপের কারণে বহু পরিবার এখনও নীরব থাকতে বাধ্য হয় বলে মানবাধিকারকর্মীরা অভিযোগ করছেন।
নাগরিক সংলাপে অংশ নিয়ে সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী স্থানীয় পর্যায়ে ধর্মীয় নেতাদের সম্পৃক্ত করে সহিংসতা প্রতিরোধে কাজ করার আহ্বান জানান। সাবেক বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথ বলেন, শুধু ভাইরাল হওয়া ঘটনা নয়, প্রতিটি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনার বিচার নিশ্চিত করতে হবে এবং এ ক্ষেত্রে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ জরুরি।
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেনও স্বীকার করেন যে দেশে আইনের অভাব নেই, সমস্যা রয়েছে আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং সামাজিক মানসিকতায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু বক্তব্য বা আশ্বাস যথেষ্ট নয়। দ্রুত বিচার, অপরাধীদের কঠোর শাস্তি, ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে একটি কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। অন্যথায় ধর্ষণ ও নারী-শিশু নির্যাতনের এই ভয়াবহ চিত্র আরও উদ্বেগজনক রূপ নিতে পারে।
দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী যদি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, তাহলে উন্নয়ন ও অগ্রগতির সব দাবিই প্রশ্নের মুখে পড়ে। তাই নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন শুধু একটি সামাজিক দায়িত্ব নয়, রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত বলে মনে করছেন সচেতন মহল।


