আদিত্য প্রতাপ ঘোষের কলাম
ইতিহাস মরে না। অষ্টম এডওয়ার্ড বলেছিলেন, ”I’m the State”। বিখ্যাত নৃবিজ্ঞানী ও জগদ্বিখ্যাত সাংবাদিক এন্থনী মাসকারেনহাস বলেছিলেন,”অষ্টম এডওয়ার্ডের এই কথার সাথে শেখ মুজিবকে দাঁড় করানো যায়, কারণ তিনিই স্বপ্ন দেখলেন একটা স্বাধীন দেশের, তিনিই আমরণ লড়াই করলেন স্বাধীন করতে, তিনিই জন্ম দিলেন একটা স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের, শেখ মুজিবই একটা প্রাতিষ্ঠানিক স্টেইট”।
ইতিহাস কেবল অপেক্ষা করে, এটাই ইতিহাসের সন্ধিক্ষণ। একটি নতুন ভূখণ্ডের, একটি নতুন প্রজন্মের, একটি নতুন কণ্ঠের, যা ফিরিয়ে আনে বারবার সেই আদর্শিক মুখের আদলে, মুখটা শেখ মুজিবের। ১৯৭১-এর বাংলাদেশ আজও সেই অপেক্ষার সাক্ষী হয়ে এসেছে স্বাধীনতাকামী বেলুচদের অন্দরে। একদিন এই ভূখণ্ডের মানুষও শুনেছিল, তোমরা আলাদা নও, তোমাদের ভাষা আলাদা হতে পারে, সংস্কৃতি আলাদা হতে পারে, কিন্তু তোমাদের ভাগ্য এক। তোমাদের ওপর শাসন করার অধিকার অন্য কারও আছে। তোমাদের সম্পদ অন্য কেউ নিয়ে যাবে। তোমাদের ভোট থাকবে, কিন্তু ক্ষমতা থাকবে না। তোমাদের রক্ত ঝরবে, কিন্তু সিদ্ধান্ত নেবে অন্যরা।
তারপর একদিন বাংলার মানুষ বলেছিল- ‘না না না’।
সেই ‘না’ একদিন রূপ নিয়েছিল স্বাধীনতার দাবিতে। আর সেই দাবির সামনে দাঁড়িয়েছিলেন একজন মানুষ- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলার বন্ধু, বাংলার মিত্র।
আজ, হাজার মাইল দূরে, পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ পাহাড়, মরুভূমি ও উপকূলজুড়ে আরেকটি জনগোষ্ঠী নিজেদের বঞ্চনা, নিপীড়ন ও অস্তিত্বের প্রশ্ন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের কণ্ঠে এখন একটি স্লোগান ঘুরে বেড়াচ্ছে-
“শেখ মুজিবের পথ ধরো,
বেলুচিস্তান স্বাধীন করো।”
স্লোগানটি কেবল কয়েকটি শব্দ নয়। এটি ইতিহাসের সঙ্গে বর্তমানের এক অদ্ভুত সংলাপ।
বেলুচদের কাছে শেখ মুজিব আজ কেবল বাংলাদেশের জাতির পিতা নন; তিনি হয়ে উঠেছেন এমন এক প্রতীকের নাম, যিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের রাজনৈতিক অধিকারকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছিলেন। যিনি বলেছিলেন, মানুষের অধিকার কোনো শাসকের দয়া নয়। অধিকার ছিনিয়ে নিতে হয়। আর যখন অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়, তখন প্রতিরোধই হয়ে ওঠে ইতিহাসের স্বাভাবিক ভাষা। এই কারণেই বেলুচিস্তানের রাজপথে আজ শেখ মুজিবের নাম উচ্চারিত হচ্ছে তোপধ্বনিতে।
সেই নামের পাশে উঠে আসছে আরেকটি নাম- মাহরাং বালোচ। তাঁকে আন্তর্জাতিক মিডিয়া নামকরণ করেছে, ‘বেলুচ স্বাধীনতা সংগ্রামের শেখ মুজিব’ অভিধায়।
বেলুচিস্তানের পাহাড়ি বাতাসে, নিখোঁজ মানুষের পরিবারের কান্নায়, মায়ের বুকফাটা আহাজারিতে, প্রিয়জনের ছবিকে বুকে আঁকড়ে ধরে দাঁড়িয়ে থাকা নারীদের সারিতে মাহরাং বালোচ যেন এক নতুন প্রতিরোধের প্রতীক। তিনি কোনো রাজপ্রাসাদ থেকে উঠে আসেননি। কোনো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা তার হাতে নেই। তার হাতে নেই সেনাবাহিনী, নেই কোনো বিশাল রাজনৈতিক সাম্রাজ্য। কিন্তু তার হাতে আছে একটি কণ্ঠস্বর, যে কণ্ঠস্বর নিখোঁজ মানুষের মায়ের হয়ে কথা বলে। গণহত্যার মুখে দীপ্তমুষ্টিতে স্বাধীনতার স্বাদার্জনের কথা বলে, কবিতার ঝংকারে মানুষের মাঝে স্বাধীনভাবে বাঁচার কথা বলে।
বেলুচদের স্বাধীনতা অর্জনের ঈপ্সা প্রায় শতাব্দীকাল ব্যাপী। আজ বেলুচরা সংগঠিত রুপান্তরিত শক্তি। কাছেপিঠে তাদের জনরোল স্বাধীনতা অর্জনের লড়াকু দীক্ষায় ঈপ্সিত। জীবন রক্ষা তাদের আজ ব্রাত্য। মননে আর স্বননে তাদের সেই একই ধ্বনি, “স্বাধীনতা”। এই উপচে আসা স্বাধীন হওয়ার স্বাদ তাদের মননে জুগিয়েছে শেখ মুজিবের অবিচল রাজনৈতিক জীবন। আর তাই মাহরাং বালোচকে তারাই বলছে ‘বেলুচদের শেখ মুজিব’।
তুলনাটি ইতিহাসের হুবহু পুনরাবৃত্তি নয়। ১৯৭১-এর বাংলাদেশ আর আজকের বেলুচিস্তান এক নয়। দুই ভূখণ্ডের ইতিহাস আলাদা, রাজনৈতিক বাস্তবতা আলাদা, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি আলাদা। কিন্তু নিপীড়িত মানুষের প্রতিটি মর্মন্তুদ স্মৃতিতে প্রতীকের জন্ম হয় যুক্তির খাতায় নয়, অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে, যন্ত্রণার জ্বালাময়ী শিখার সলতেতে।
একজন মানুষ যখন কোটি মানুষের কণ্ঠ হয়ে ওঠেন, তখন তিনি আর কেবল ব্যক্তি থাকেন না। তিনি হয়ে ওঠেন প্রতীক। শেখ মুজিব যেমন বাঙালির কাছে একটি জাতির আত্মপরিচয়ের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন, মাহরাং বালোচ তেমনি বেলুচদের কাছে আজ হয়ে উঠেছেন তাদের হারিয়ে যাওয়া মানুষদের, তাদের অপমানিত অস্তিত্বের এবং তাদের দীর্ঘ প্রতিরোধের প্রতীক।
বেলুচিস্তানের গল্প নতুন নয়। দশকের পর দশক ধরে এই অঞ্চল পাকিস্তানের রাজনীতিতে এক অস্বস্তিকর প্রশ্ন হয়ে আছে। পাহাড়ের নিচে সম্পদ, সমুদ্রের পাশে বন্দর, মাটির নিচে খনিজ, কিন্তু সেই সম্পদের মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে বেলুচদের বিষয়ে কেন এত বিভেদ?
যে মাটির নিচে সম্পদ, সেই মাটির মানুষের ঘরে কেন অন্ধকার? যে ভূখণ্ড কৌশলগতভাবে এত গুরুত্বপূর্ণ, সেই ভূখণ্ডের মানুষ কেন নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে এত অনিশ্চিত? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়েই বহু বেলুচ তরুণ অস্ত্র হাতে নিয়েছে। কেউ পাহাড়ে উঠেছে। কেউ নিখোঁজ হয়েছে। কেউ কারাগারে গেছে। কেউ আর ফিরে আসেনি। আর তাদের পরিবারের নারীরা? তারা অপেক্ষা করেছে। একটি দরজার দিকে তাকিয়ে থেকেছে। একটি আশায় রাত পার করেছে। একটি ছবিকে বুকে চেপে ধরে বলেছে, “সে সন্ত্রাসী নয়, সে আমার সন্তান।”
এই কান্নার ভেতর থেকেই মাহরাং বালোচের উত্থান। তিনি সেই নারীদের কণ্ঠ, যারা প্রিয়জনকে হারিয়েও নীরব হননি। তিনি সেই মায়েদের প্রতীক, যারা রাষ্ট্রের কাছে প্রশ্ন করেছেন, ‘আমার সন্তান কোথায়’?
এই প্রশ্নের কোনো উত্তর না থাকলে ইতিহাস একদিন আরও বড় প্রশ্ন করে বসে-
একটি রাষ্ট্র তার নাগরিককে কতদিন নিখোঁজ রাখতে পারে?
একটি জনগোষ্ঠীর বেদনা কতদিন চাপা রাখা যায়?
একটি জাতির আত্মপরিচয়ের প্রশ্নকে কতদিন বন্দুক দিয়ে থামিয়ে রাখা যায়? ইতিহাসের উত্তর খুব নির্মম। কোনো সাম্রাজ্য চিরস্থায়ী নয়। কোনো দমননীতি অনন্তকাল টেকে না। মানুষের স্মৃতি কখনো কখনো রাষ্ট্রের বন্দুকের চেয়েও দীর্ঘজীবী হয়।
১৯৭১ সালে পাকিস্তানের শাসকরা হয়তো ভেবেছিল, বাঙালির কণ্ঠস্বরকে বন্দুক দিয়ে থামিয়ে দেওয়া যাবে। তারা ভুল করেছিল। একজন শেখ মুজিবকে কারাগারে বন্দি করা যায়। কিন্তু একটি জাতির আকাঙ্ক্ষাকে বন্দি করা যায় না। যে স্বাধীনতার মশাল শেখ মুজিব জ্বালিয়েছিলেন, অনন্তকাল সেই আলো পৌছে যায় পৃথিবীর প্রতিটি স্বাধীনতাকামী মানুষের হৃদে।
আজ বেলুচিস্তানের মানুষ যখন শেখ মুজিবের নাম উচ্চারণ করে, তখন তারা সেই ইতিহাসের কাছেই ফিরে যাচ্ছে। তারা বলছে-
যে মানুষ একদিন বাঙালিকে বলেছিলেন, “তোমাদের অধিকার তোমাদেরই নিতে হবে”,
আমরাও সেই পথের কথা মনে রেখেছি।
তবে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো- স্বাধীনতা কেবল স্লোগানে আসে না। স্বাধীনতার জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সংগঠন, জনগণের ঐক্য, নেতৃত্ব, আন্তর্জাতিক বাস্তবতা এবং সবচেয়ে বড় কথা, একটি জনগোষ্ঠীর দীর্ঘস্থায়ী আকাঙ্ক্ষা।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা এসেছিল এক দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, গণআন্দোলন, রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির জটিল সমীকরণের মধ্য দিয়ে। সেখানে প্রায় অসম্ভব কাজকে প্রাতিষ্ঠানিক রুপ দিয়েছিলেন শেখ মুজিব। বেলুচিস্তানের পথও সহজ নয়। সেখানে রয়েছে পাকিস্তানের সামরিক শক্তি। রয়েছে আঞ্চলিক ভূরাজনীতির জটিলতা। রয়েছে সশস্ত্র গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ড, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা-যুক্তি এবং আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর নিজস্ব স্বার্থ।
কিন্তু রাজনীতি কখনো শুধু শক্তির হিসাব নয়। রাজনীতি কখনো কখনো মানুষের স্মৃতির হিসাবও। আর বেলুচিস্তানের মানুষ আজ তাদের স্মৃতির ভেতর বাংলাদেশের ইতিহাসকে খুঁজছে। তারা খুঁজছে সেই লড়াই, যেখানে একটি জনগোষ্ঠী বলেছিল, ‘আমরা আর পরাধীন থাকতে চাই না’।৷ তারা খুঁজছে সেই নেতাকে, যিনি একটি ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অধিকারকে জাতীয় মুক্তির প্রশ্নে পরিণত করেছিলেন। ৭ কোটি বাঙালী এক জবানে সুবিকশিত ছিল,
“তোমার নেতা, আমার নেতা, শেখ মুজিব, শেখ মুজিব, “জেলের তালা ভাঙবো, শেখ মুজিবকে আনবো”
সেই জগদ্বল পাথরের ইতিহাসের ছায়ায় দাঁড়িয়ে আজ মাহরাং বালোচকে ঘিরে তৈরি হচ্ছে নতুন এক প্রতীকী উপমা।
বেলুচদের শেখ মুজিব।
এটি ইতিহাসের সরল পুনরাবৃত্তি নয়।
এটি ইতিহাসের প্রতিধ্বনি। বাংলার রাজপথে একদিন যে স্বাধীনতার স্বপ্ন উচ্চারিত হয়েছিল, আজ সেই স্বপ্নের শব্দ বেলুচিস্তানের পাহাড়ে গিয়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
একদিন বাংলার মানুষ বলেছিল- জয় বাংলা ।
আজ বেলুচিস্তানের কোনো এক অন্ধকার রাতের বিক্ষোভে, কোনো এক মায়ের কান্নার ভেতর, কোনো এক তরুণের হাতে ধরা প্ল্যাকার্ডে লেখা থাকে-
“শেখ মুজিবের পথ ধরো,
বেলুচিস্তান স্বাধীন করো।”
ইতিহাসের চাকা কখনো একই জায়গায় ফিরে আসে না। কিন্তু মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা,
সেটি বারবার ফিরে আসে। নতুন নামে।নতুন মুখে। নতুন পতাকায়। কখনো কখনো একজন নারীর কণ্ঠে, সেই কণ্ঠের নাম
মাহরাং বালোচ; বেলুচিস্তানের স্বাধীনতাকামীদের কাছে যিনি প্রতিধ্বনিত শেখ মুজিব।
যে জাতি রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রস্তুত, যাদের অন্তঃজ্বালায় বিস্ফোরিত লেলিহান শিখায় উদ্দীপিত স্লোগান শেখ মুজিবের নামে, সে জাতির স্বাধীনতা অর্জন কেবল সময়ের অপেক্ষা মাত্র।
তাই,
“পৃথিবীর সব ফুল বাগিচায়,
লালচে গোলাপ ফুঁটুক,
পৃথিবীর সব ভুখা স্বাধীনতাকামী
শেখ মুজিব হয়ে উঠুক”।
জয় বাংলা।।
আদিত্য প্রতাপ ঘোষ
লেখক, ব্লগার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক


