জমি নিয়ে বিরোধের জেরে বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ; মামলা করতে গিয়ে উল্টো সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার বৃদ্ধা
কুষ্টিয়ার সদর উপজেলায় জায়গা-জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমিনের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ উঠেছে। ওই ঘটনায় মামলা করতে গিয়ে উল্টো বিএনপি কার্যালয় ভাঙচুরের মামলায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যেতে হয়েছে তার ৬৮ বছর বয়সী মা নূরজাহান বেগমকে।
পরিবারের অভিযোগ, নূরজাহান বেগম বিএনপি কার্যালয় ভাঙচুরের মামলার এজাহারভুক্ত আসামি নন। ওই মামলার আসামি তার ছেলে রুহুল আমিন। তিনি বর্তমানে আত্মগোপনে রয়েছেন। তবে পুলিশ বলছে, তদন্তে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে সন্দেহভাজন হিসেবে নূরজাহান বেগমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
নূরজাহান বেগম কুষ্টিয়া সদর উপজেলার পাটিকাবাড়ি ইউনিয়নের নলকুলা গ্রামের বাসিন্দা। তিনি আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমিনের মা। রুহুল আমিন ওই ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন বলে জানা গেছে।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, গত ১৫ সেপ্টেম্বর রাতে স্থানীয় সামাজিক প্রতিপক্ষের শতাধিক লোক ‘আওয়ামী লীগের ট্যাগ’ দিয়ে রুহুল আমিনের বাড়িতে হামলা চালায়। এ সময় বাড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
রুহুল আমিনের মেয়ে নাসিমা খাতুনের অভিযোগ, হামলাকারীরা রুহুল আমিনের নাম ধরে ডাকাডাকি করতে থাকে। তিনি বাইরে বের হলে তাকে মারধরের চেষ্টা করা হয়। প্রাণ বাঁচাতে রুহুল আমিন একটি পাটের গুদামে আশ্রয় নেন। পরে ওই গুদামেও আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এতে পরিবারের কয়েকজন আহত হন বলেও দাবি করেন তিনি।
নাসিমা খাতুন জানান, পরদিন তার মা নূরজাহান বেগম হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় মামলা করতে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানায় যান। কিন্তু পুলিশ মামলা নিতে গড়িমসি করায় শেষ পর্যন্ত ২১ সেপ্টেম্বর আদালতে মামলা করেন তিনি।
এরপর রোববার সকালে পুলিশ নূরজাহান বেগমকে থানায় ডেকে নেয়। পরিবারের সদস্যদের বলা হয়, আদালতে মামলা করার বিষয়ে কথা বলবেন ওসি। কিন্তু দুপুর গড়িয়ে গেলেও তাকে ছেড়ে না দেওয়ায় পরিবারের পক্ষ থেকে কারণ জানতে চাওয়া হয়। তখন পুলিশ জানায়, নূরজাহান বেগমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাকে আদালতে পাঠানো হবে।
নূরজাহানের ছোট মেয়ে সেলিনা খাতুন বলেন, ‘সকালে পুলিশ বাড়িতে এসে মাকে জিজ্ঞাসা করে তিনি আদালতে মামলা করেছেন কি না। ওসি কথা বলবেন জানিয়ে তাকে থানায় নিয়ে যায়। পরে জানতে পারি, তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার ভাই রুহুল আমিন আওয়ামী লীগ করে। সে এখন পলাতক। ছেলের কারণে বৃদ্ধ মাকেই জেলে যেতে হলো। থানা মামলা না নিলে আদালতে মামলা করা কি অপরাধ?’
এদিকে বিএনপি কার্যালয়- কৃষকদলের কার্যালয়- ভাঙচুরের ঘটনায় করা মামলার বাদী হাবিবুর রহমান। তিনি কৃষকদলের নেতা হিসেবে পরিচিত বলে স্থানীয়ভাবে জানা গেছে। নূরজাহান বেগমের মেয়ে নাসিমা খাতুনের দাবি, হাবিবুর রহমানের সঙ্গে তাদের পরিবারের জায়গা-জমি নিয়ে বিরোধ রয়েছে।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, গত ১৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যার পর নলকুলা গ্রামের ১ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত কৃষকদলের কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুর করা হয়। একই সঙ্গে কার্যালয়ের ভেতরে অবস্থানরত ব্যক্তিদের মারধরের অভিযোগও আনা হয়েছে। এ ঘটনায় ৭৫ জনের নাম উল্লেখ করে আরও ১০০ থেকে ১২০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে।
পরিবারের দাবি, রুহুল আমিনের বাড়িতে হামলা এবং কৃষকদল কার্যালয়ে হামলা- দুই ঘটনাই একই দিনে ঘটেছে। ফলে দুটি ঘটনার সময় ও প্রেক্ষাপট নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম মামুনুর রশীদ বলেন, ১৫ সেপ্টেম্বর রাতে আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমিনের নেতৃত্বে স্থানীয় বিএনপি কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে রুহুল আমিনের মা নূরজাহান বেগমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ওসি জানান, তাকে আদালতে পাঠানো হলে আমলি আদালতের বিচারক সানা খাতুন তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
অন্যদিকে, নূরজাহান বেগমের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ এবং তাকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছে- যে মামলায় তিনি এজাহারভুক্ত আসামি নন, সেই মামলায় তাকে কীভাবে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করা হলো এবং আদালতে মামলা করার পরপরই কেন তাকে থানায় ডেকে নেওয়া হয়েছিল।


