সরকারি চাকরিতে বদলি হয়ে যোগদান করলেও এক বছরের বেশি সময় ধরে স্বাভাবিকভাবে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করতে পারছেন না কক্সবাজার সরকারি কলেজের দুই শিক্ষক। কলেজে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করলেই শিক্ষার্থীদের একটি অংশের বিক্ষোভ, ঘেরাও ও হেনস্তার মুখে পড়ছেন বলে অভিযোগ তাদের। এক পর্যায়ে একজন শিক্ষককে কক্ষে আটকে রাখা এবং পুলিশি সহায়তায় উদ্ধার করার ঘটনাও ঘটেছে।
অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের একটি অংশের দাবি, দুই শিক্ষকের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অসদাচরণ, রাজনৈতিক পক্ষপাত ও প্রশাসনিক অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
ভুক্তভোগী দুই শিক্ষক হলেন ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মুজিবুল আলম এবং ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক অলক চক্রবর্তী।
সহযোগী অধ্যাপক মুজিবুল আলম বলেন, ২০২৫ সালের ২০ জুলাই কক্সবাজার সরকারি কলেজে বদলির আদেশ পাওয়ার পর থেকে অন্তত ১০ বারের বেশি কলেজে গিয়ে ফিরে আসতে হয়েছে। তার অভিযোগ, প্রতিবারই সংগঠিতভাবে তাকে বাধা দেওয়া হয়েছে।
তার ভাষায়, “আমি শুধু সরকারি দায়িত্ব পালন করতে চাই। সরকার যেখানে পোস্টিং দিয়েছে, সেখানে নিরাপদে কাজ করার সুযোগ তো থাকতে হবে।”
তিনি জানান, গত ১৬ জুন কলেজে গেলে তাকে একটি কক্ষে আটকে রাখা, মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া এবং শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়। পরে পুলিশ এসে তাকে উদ্ধার করে। এ ঘটনায় তিনি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন।
ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক অলক চক্রবর্তীও দীর্ঘ সময় ধরে স্বাভাবিকভাবে পাঠদান করতে পারছেন না। তবে তিনি এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক আবুল হাসনাত মোহাম্মদ মফিজুল হক বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো শিক্ষককে কলেজে আসতে বাধা দেওয়া হয়নি। তবে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে পুলিশ ডেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে।
তার বক্তব্য, “কলেজ প্রশাসনের পক্ষে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।”
শৃঙ্খলা কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক মফিদুল আলম বলেন, বাস্তবে দুই শিক্ষকই দীর্ঘ সময় ধরে নিয়মিত পাঠদান করতে পারেননি।
ইসলামী ছাত্রশিবির, ছাত্রশক্তি এবং শিক্ষার্থীদের একটি অংশের দাবি, দুই শিক্ষকের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অসদাচরণ, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়, রাজনৈতিক পক্ষপাত এবং বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। তাদের ভাষ্য, এসব কারণেই শিক্ষার্থীরা দুই শিক্ষককে প্রত্যাখ্যান করেছে।
তবে অভিযোগগুলোর স্বপক্ষে কোনো বিভাগীয় তদন্তের প্রতিবেদন বা আদালতের রায় এখনো প্রকাশিত হয়নি। স্বাধীনভাবেও অভিযোগগুলোর সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
কলেজ শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক রিদুয়ান উল হক বলেন, কোনো শিক্ষক অন্যায় করলে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কিন্তু কাউকে ঘেরাও, লাঞ্ছিত বা ‘মব’ তৈরি করে দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।
কলেজের শিক্ষক পরিষদের এক জ্যেষ্ঠ সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অভিযোগের নিষ্পত্তি ছাড়াই দুই শিক্ষক কার্যত এক বছরের বেশি সময় ধরে শ্রেণিকক্ষের বাইরে। একই সঙ্গে নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতেও দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
তার মতে, এই পরিস্থিতি শুধু দুই শিক্ষকের ব্যক্তিগত সংকট নয়; বরং এটি সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আইনের শাসন, প্রশাসনিক কর্তৃত্ব এবং শিক্ষার পরিবেশ রক্ষার সক্ষমতা নিয়েও বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।
অভিযোগ প্রমাণের দায়িত্ব আইন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের। সেই প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই যদি কোনো সরকারি কর্মচারী কার্যত দায়িত্ব পালন থেকে বঞ্চিত হন, তাহলে ভবিষ্যতে একই ধরনের পরিস্থিতি অন্য প্রতিষ্ঠানেও সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।


