পাকিস্তানি বাহিনীর নির্যাতনের শিকার নববধূ, আশ্রয় দিতে গিয়ে মাকেও হতে হয়েছিল স্বামীর ঘরছাড়া
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ শুধু একটি দেশের স্বাধীনতার ইতিহাস নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য মানুষের না বলা কষ্ট, নির্যাতন ও আত্মত্যাগের গল্প। সেই ইতিহাসেরই এক নির্মম অধ্যায়ের সাক্ষী কুড়িগ্রামের সদর উপজেলার বেলগাছা ইউনিয়নের কালে গ্রামের আবিরন বেওয়া।
মুক্তিযুদ্ধের সময় আবিরন ছিলেন সদ্যবিবাহিত এক তরুণী। তাঁর স্বামী হোসেন মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার খবর পেয়ে তাঁদের বাড়িতে হামলা চালায় পাকিস্তানি সেনারা। প্রাণ বাঁচাতে পালানোর চেষ্টা করেও শেষ রক্ষা হয়নি আবিরনের। সেনাদের হাতে ধরা পড়েন তিনি। পরে কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা তাঁকে ধর্ষণ করে ফেলে রেখে যায়।
সেই বর্বরতার পরও শেষ হয়নি আবিরনের দুর্ভোগ। যুদ্ধের ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়ে স্বামীর বাড়িতে ফিরলেও সেখানে আর আশ্রয় পাননি তিনি। স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাঁকে গ্রহণ করেননি। বাধ্য হয়ে ফিরে আসতে হয় বাবার বাড়িতে।
মেয়ে আবিরনকে আশ্রয় দেওয়ার অপরাধেও সামাজিক নিগ্রহের শিকার হতে হয় তাঁর মা কাছিরন বেওয়াকে। মেয়েকে নিজের কাছে রাখায় স্বামী আজিমুদ্দিন তাঁকে তালাক দেন। এরপর মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে কাছিরন বাবার বাড়ি ইউসুফের আশ্রয় নেন। কিন্তু সেখানেও মা-মেয়ের স্থায়ী আশ্রয় মেলেনি।
একপর্যায়ে আবিরনের নানি কাচুয়ানী তাঁদের কাছে রাখতে চাইলেও নানা প্রতিকূলতায় সেটিও সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত অন্যের বাড়ির পাশে ঝুপড়ি তুলে মা-মেয়েকে জীবন কাটাতে হয়। পরে কাছিরনের বাবা মারা গেলে এবং তাঁর নানার কোনো ছেলে সন্তান না থাকায় উত্তরাধিকারসূত্রে সেই বাড়িতে আশ্রয় পান তাঁরা।
মুক্তিযুদ্ধের সময়ের সেই ভয়াবহ স্মৃতি আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন আবিরন। যুদ্ধের সময় স্বামীকে হারানো, পাকিস্তানি বাহিনীর নির্যাতন, স্বজনদের প্রত্যাখ্যান এবং পরবর্তী জীবনের দারিদ্র্য—সব মিলিয়ে তাঁর জীবন যেন এক দীর্ঘ বেদনার ইতিহাস।
বর্তমানে নিঃসন্তান আবিরন বেওয়া তাঁর মা কাছিরন বেওয়ার সঙ্গেই কালে গ্রামে বসবাস করছেন। আবিরনের স্বামীর বাড়ি ছিল কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ফরকেরহাটে। তাঁর বাবার বাড়ি মুক্তারাম এবং নানার বাড়ি কালে গ্রামে।
একসময় কাছিরন বেওয়া একটি জীর্ণ টিনের ঝুপড়িতে বসবাস করতেন। কয়েক বছর আগে জাপানপ্রবাসীদের সহায়তায় তাঁর জন্য একটি ছোট টিনের ঘর তৈরি করে দেওয়া হয়। নতুন ঘর পাওয়ার পরও কাছিরনের মুখে ফুটে ওঠে জীবনের দীর্ঘ বঞ্চনার গভীর হাহাকার। তিনি বলেছিলেন, “এখন তো আমার মরার সময়, ঘর দিয়া আমার আর কী হবে?”
কাছিরনের সেই কথার মধ্যে যেন লুকিয়ে আছে একটি পুরো জীবনের কষ্ট- যে জীবনে মেয়েকে আশ্রয় দিতে গিয়ে নিজেই স্বামীর ঘর হারাতে হয়েছে, আর সেই মেয়েকেও সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হয়েছে একাত্তরের নির্মম নির্যাতনের ক্ষত।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি এমন নির্যাতিত নারী ও তাঁদের পরিবারের আত্মত্যাগও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আবিরন বেওয়ার জীবন তাই শুধু ব্যক্তিগত বেদনার গল্প নয়; এটি একাত্তরের নির্মমতার সাক্ষ্য এবং যুদ্ধের পরও নারীদের বয়ে বেড়ানো সামাজিক ও মানসিক যন্ত্রণার এক জীবন্ত দলিল।


