টানা আট দিনের অতি ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজারে ভয়াবহ বন্যা ও পাহাড়ধসের ঘটনায় রোহিঙ্গাসহ অন্তত ৩২ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন আরও একজন। জেলার প্রায় অর্ধেক এলাকা প্লাবিত হওয়ায় আড়াই লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১ হাজার ৬১৩টি বসতবাড়ি, হাজার হাজার হেক্টর কৃষিজমি, মৎস্য খামার, সড়ক, সেতু ও বেড়িবাঁধ।
রবিবার রাত থেকে বৃষ্টি কমে আসায় সোমবার থেকে বিভিন্ন এলাকায় ধীরে ধীরে পানি নামতে শুরু করেছে। তবে পানি নেমে গেলেও দুর্ভোগ কাটেনি। অনেক এলাকায় এখনো ঘরবাড়ি পানির নিচে, নলকূপ ডুবে থাকায় দেখা দিয়েছে তীব্র সুপেয় পানির সংকট। রান্নার চুলা জ্বালানো সম্ভব না হওয়ায় বহু পরিবার খাদ্য সংকটে দিন কাটাচ্ছে।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, ৪ থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত মাত্র নয় দিনে জেলায় ৮২৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম সর্বোচ্চ। সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাত হয়েছে মাত্র ৪ মিলিমিটার, ফলে বন্যার পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে।
জেলার ৭১টি ইউনিয়নের মধ্যে ৬৯টি এবং ৫টি পৌরসভার মধ্যে ৪টি প্লাবিত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পেকুয়া উপজেলা, যেখানে প্রায় ৯৫ শতাংশ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। এছাড়া মাতামুহুরী, চকরিয়া, কুতুবদিয়া, মহেশখালী, রামু, উখিয়া, টেকনাফ, কক্সবাজার সদর ও ঈদগাঁও উপজেলাও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পাহাড়ধস ও বন্যাজনিত বিভিন্ন দুর্ঘটনায় ১৩ জন রোহিঙ্গাসহ মোট ৩২ জনের মৃত্যু হয়েছে। সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে উখিয়ায়, যেখানে পাহাড়ধসে ১৪ জন নিহত হন। এছাড়া চকরিয়ায় ৬ জন, রামুতে ৩ জন, কক্সবাজার সদরে ৩ জন, পেকুয়ায় ২ জন এবং মাতামুহুরী, মহেশখালী ও কুতুবদিয়ায় একজন করে মারা গেছেন। চকরিয়ায় একজন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
বন্যায় ১ হাজার ৬১৩টি বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে পেকুয়ায়, যেখানে ৪৫০টি ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। এছাড়া চকরিয়া, কুতুবদিয়া, মহেশখালী, মাতামুহুরী, টেকনাফ, উখিয়া, রামু, ঈদগাঁও ও কক্সবাজার সদরেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
জেলা মৎস্য বিভাগের হিসাবে, মৎস্য খাতে প্রায় ৪৬ কোটি ২২ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। বন্যায় ৩ হাজার ৯১৮টি পুকুর ও ৪৫৩টি চিংড়িঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে এক হাজার টনের বেশি মাছ, শত শত টন চিংড়ি এবং কোটি কোটি মাছ ও চিংড়ির পোনা নষ্ট হয়েছে।
অন্যদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক হিসাবে, ৪ হাজার ২১১ হেক্টর কৃষিজমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আউশ ধান, আমনের বীজতলা, পানবরজ ও বিভিন্ন ধরনের শাকসবজির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এতে ৪৩ হাজার ২১০ জন কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
প্রায় ২ হাজার ৪৮ কিলোমিটার সড়ক এবং ৭৯টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতাধীন ৪৪টি স্থানে বেড়িবাঁধ ভেঙে বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চকরিয়ার কোনাখালী এলাকায় প্রায় ২৫ মিটার বেড়িবাঁধ ও একটি সেতুর অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এছাড়া বন্যার পানিতে ৩০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার অধিকাংশই পেকুয়া ও কুতুবদিয়া উপজেলায়।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ৬১৮টি আশ্রয়কেন্দ্রে ১ হাজার ৫৮০ জন আশ্রয় নিয়েছেন। দুর্গত মানুষের মধ্যে ৭ হাজার ৭৯০ প্যাকেট শুকনো খাবার ও ২৯৮ টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের তুলনায় ত্রাণ অপ্রতুল এবং সবচেয়ে বড় সংকট এখন নিরাপদ খাবার পানি।
বর্তমানে জেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, নৌবাহিনীসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থা এবং সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন দুর্গত এলাকায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
দুর্গত এলাকা পরিদর্শন শেষে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য অমিত বলেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি মানুষের পাশে সরকার রয়েছে। দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কাছে সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে এবং তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে দুর্গত এলাকার অনেক বাসিন্দার অভিযোগ, সরকারের পক্ষ থেকে সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে এখনো প্রয়োজনীয় ত্রাণ ও পুনর্বাসন সহায়তা তাদের কাছে পর্যাপ্তভাবে পৌঁছেনি। অনেক পরিবার এখনো খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও নিরাপদ আশ্রয়ের সংকটে দিন কাটাচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্তদের দাবি, বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে বারবার মানুষের পাশে থাকার আশ্বাস দেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে সেই প্রতিশ্রুতির পূর্ণ প্রতিফলন তারা দেখছেন না।


