বাংলাদেশে মানবাধিকার, রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি এবং গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সেমিনারে জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রতিবেদন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিবিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়। তিনি জাতিসংঘের প্রতিবেদনে উল্লেখিত ‘১,৪০০ জন নিহত’ হওয়ার দাবির পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশের আহ্বান জানিয়ে বলেন, এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক সংস্থার দায়িত্ব।
সোমবার (১৩ জুলাই) অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের উলফসন কলেজের লিওনার্ড উলফসন অডিটোরিয়ামে কানাডাভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল সেন্টার ফর ডেমোক্রেটিক গভর্ন্যান্স (GCDG)-এর উদ্যোগে “Bangladesh at a Democratic Crossroads: Human Rights, Political Inclusion, and the Future of Democratic Governance” শীর্ষক এই আন্তর্জাতিক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।
হাইব্রিড পদ্ধতিতে আয়োজিত সেমিনারে অডিটোরিয়াম ছিল দর্শকে পরিপূর্ণ। পাশাপাশি অনলাইন সম্প্রচারও ব্যাপক সাড়া ফেলে, যেখানে কয়েক লাখ দর্শক অনুষ্ঠানটি অনুসরণ করেন বলে আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়।
অনলাইন প্যানেলে বক্তব্য দেন সজীব ওয়াজেদ জয়, ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সাবেক সদস্য ও সাউথ এশিয়া ডেমোক্রেটিক ফোরামের নির্বাহী পরিচালক পাওলো কাসাকা, লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের (LSE) অধ্যাপক প্রফেসর তারুন খাইতান এবং ইন্টারন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস কমিশনের (IHRC) ডেপুটি অ্যাম্বাসেডর স্যার ভিনসেন্ট লিন।
নিজ বক্তব্যে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, জাতিসংঘের প্রতিবেদনে উল্লিখিত নিহতদের পরিচয় ও তথ্য প্রকাশ করা হলে বিষয়টি আরও স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য হবে। তিনি বলেন, “স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে জাতিসংঘের উচিত ১,৪০০ নিহতের দাবির পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করা।”
তিনি আরও বলেন, দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক শক্তিকে বাইরে রেখে কোনো নির্বাচনকে প্রকৃত অর্থে অংশগ্রহণমূলক বা সর্বজনগ্রাহ্য বলা যায় না। তাঁর মতে, রাজনৈতিক বর্জনের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে কোনো সরকার স্থিতিশীল থাকতে পারে না। আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার বিরোধিতা করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের টেকসই গণতন্ত্রের স্বার্থে সব বড় রাজনৈতিক দলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ থাকা প্রয়োজন।
অন্তর্বর্তীকালীন ও বর্তমান সরকারের কিছু নীতির সমালোচনা করে জয় দাবি করেন, এসব পদক্ষেপ দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, বিএনপির অনেক নেতাসহ দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির বিরোধিতা করে।
সেমিনারে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের ড. নায়লা হক বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং বাংলাদেশের সাবেক প্রধান বিচারপতি ও তাঁর পিতার মুক্তির দাবি জানান। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আইনের শাসন ও মানবাধিকার রক্ষায় আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. রায়হান রশীদ আওয়ামী লীগের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়ে বলেন, টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য দেশের সব প্রধান রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এছাড়া আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোনা হাগগৌ স্ট্রিন্ডবার্গ সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী শাহরিয়ার কবিরসহ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলায় আটক ব্যক্তিদের মুক্তির আহ্বান জানান। তিনি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া এবং মৌলিক মানবাধিকার সুরক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
সেমিনারের সমাপনী পর্বে বক্তারা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ, মানবাধিকার, রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁরা শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সংলাপ, জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা এবং সব রাজনৈতিক শক্তির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মাধ্যমে দেশের গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানান।


