আদিত্য প্রতাপ ঘোষের কলাম
পৃথিবীর ইতিহাসে স্বাধীনতা যুদ্ধের পরাজিত বাহিনীর পরিচয় মুছে দিয়ে স্বাধীনতার ইতিহাসকে নতুন করে লেখার এমন অভিনব আয়োজন আর কোথাও আছে কি না, ইতিহাসবিদেরা খুঁজে দেখতে পারেন। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা সেই গবেষণার জন্য একটি আকর্ষণীয় অধ্যায় হতে পারে। কারণ প্রশ্নটা এখন আর শুধু আওয়ামী লীগ বনাম বিএনপি নয়, শেখ হাসিনা বনাম বিরোধী দলও নয়। প্রশ্নটা আরও মৌলিক, “বাংলাদেশ কি তার নিজের জন্মের ইতিহাস নিয়েই অস্বস্তিতে পড়তে শুরু করেছে?”
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার হায়েনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করেছিল। সেই আত্মসমর্পণ ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার সামরিক সমাপ্তির প্রতীক এবং ভূ-মানচিত্রে একটি স্বাধীন দেশের অভ্যুদয়। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সেই ঐতিহাসিক স্থান তাই কেবল একটি মাঠ নয়; এটি একটি দখলদার হায়েনাদের পরাজয়ের স্মারক, একটি মহান জাতির মহান নেতা শেখ মুজিবের নেতৃত্বে একটা রাষ্ট্রের বিজয়ের সাক্ষ্য এবং একটি রাষ্ট্রের জন্মসূত্রিক দৃশ্যমান দলিল। সেই জায়গায় যদি আত্মসমর্পণের স্মৃতি, পাকিস্তানি পরাজয়ের প্রতীক কিংবা মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক উপস্থাপনাকে সরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই, ‘আমরা কি সৌন্দর্যায়ন করছি, নাকি স্মৃতির পুনর্লিখন করছি পরাজিতের কষ্ট লাঘবে?’ সৌন্দর্যায়ন আর ইতিহাসের নির্বীজন এক জিনিস নয়।
যে হায়েনাদের পরাজয় বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছে, সেই পরাজয়ের স্মারককে যদি অস্বস্তিকর মনে হয়, তাহলে অস্বস্তিটা আসলে কোথায়? পাকিস্তানের জাতীয় সংগীত গাইতে যাদের সমস্যা হয়নি, স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত নিয়ে যাদের আপত্তি তৈরি হয়েছিল, সেই ইতিহাস আমরা কি ভুলে যাব? পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা জিন্নাহকে নিয়ে যাদের আপত্তি ছিল না, অথচ বাংলাদেশের স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা হিসেবে স্বীকার করা নিয়ে যাদের আপত্তি ছিল, সেই রাজনৈতিক দ্বৈততার ইতিহাসও কি হঠাৎ করে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাবে?
আর ‘জয় বাংলা’?
একটি শব্দ কীভাবে একটি জাতির মুক্তির আকাঙ্ক্ষার প্রতীকে পরিণত হয়, ১৯৭১ তার অসাধারণ উদাহরণ। সেই শব্দ উচ্চারণ নিয়ে যদি আজও ভয়, মামলা, গ্রেপ্তার কিংবা সামাজিক হয়রানির প্রশ্ন ওঠে, তাহলে সেটা শুধু একটি স্লোগানের প্রশ্ন নয়। সেটা রাষ্ট্রের নিজের ইতিহাসের সঙ্গে তার সম্পর্কের প্রশ্ন। রাষ্ট্রীয় প্রতারণা এখানেই।
অবশ্যই মহান মুক্তিযুদ্ধ কোনো রাজনৈতিক সম্পত্তি নয়। কিন্তু এখানেই সবচেয়ে বড় ভেলকিটা শুরু হয়। ‘মুক্তিযুদ্ধ আওয়ামী লীগের বাপের সম্পত্তি নয়’- এই কথাটি যদি মুক্তিযুদ্ধকে দলীয় মালিকানা থেকে মুক্ত করার দাবি হয়, তাহলে সেটি যৌক্তিক রাজনৈতিক বক্তব্য হতে পারে। কিন্তু একই কথাকে যদি এমনভাবে ব্যবহার করা হয়, যাতে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব, ৭ মার্চ, ১৬ ডিসেম্বর, ‘জয় বাংলা’, পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ কিংবা স্বাধীনতার রাজনৈতিক ইতিহাস সবকিছুকেই সন্দেহের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যায়, তাহলে প্রশ্ন উঠবে: মুক্তিযুদ্ধকে দলীয় রাজনীতি থেকে মুক্ত করা হচ্ছে, নাকি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকেই রাজনৈতিকভাবে নির্বাসিত করা হচ্ছে? তাহলে আওয়ামী লীগই ঘুরেফিরে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষীয় এবং একক ঠিকাদারি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বুঝে পায়।
এখানে ‘ইনক্লুসিভ বাংলাদেশ’-এর কথাটিও একটু খতিয়ে দেখা দরকার। অবশ্যই বাংলাদেশ সবার। রাষ্ট্র কোনো দলের একার নয়। মতাদর্শের বহুত্ব থাকবে। রাজনৈতিক বিরোধিতা থাকবে। ক্ষমতার পালাবদল হবে। কিন্তু অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র মানে কি স্বাধীনতার পক্ষে এবং স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থানকে একই ঐতিহাসিক মর্যাদায় দাঁড় করিয়ে দেওয়া? বাংলাদেশ কেন নিজের মুক্তিযুদ্ধের ক্ষেত্রে এমন এক অদ্ভুত নিরপেক্ষতা আবিষ্কার করবে, যেখানে স্বাধীনতার পক্ষ এবং স্বাধীনতার বিরোধিতার ঐতিহাসিক পার্থক্যটিই ধীরে ধীরে অস্পষ্ট হয়ে যায়? এবং সেটা পরাজিতের পক্ষ নেয় স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে শ্বাস নিয়েই!
আর যারা এতদিন বলেছিলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের ব্যবসা বন্ধ হোক’, তাদের কাছে এখন একটি সহজ প্রশ্ন। পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের স্মারক যদি পরিবর্তনের মুখে পড়ে, মুক্তিযুদ্ধের প্রতীক নিয়ে অস্বস্তি তৈরি হয়, ‘জয় বাংলা’ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তখন আপনারা কোথায়? মুক্তিযুদ্ধের নামে রাজনৈতিক ব্যবসা বন্ধ করার দাবির সঙ্গে ইতিহাসের স্মৃতি মুছে ফেলার কোনো সম্পর্ক নেই। বরং সত্যিকারের ইতিহাসপ্রেমী মানুষের দায়িত্ব হবে দলমত নির্বিশেষে মুক্তিযুদ্ধের দলিল, স্মারক ও সত্যকে রক্ষা করা।
আওয়ামী লীগ থাকবে কি থাকবে না, শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকবেন কি না, বিএনপি ক্ষমতায় আসবে কি না এসব ইতিহাসের দীর্ঘ সময়ের তুলনায় ক্ষণস্থায়ী রাজনৈতিক ঘটনা। কিন্তু ১৯৭১? সেটি বাংলাদেশের জন্মের বছর। আর ১৬ ডিসেম্বর? সেটি হায়েনা রক্তপিপাসু, পরাজিত রাষ্ট্রের আত্মসমর্পণ এবং একটি মহানতর নতুন রাষ্ট্রের বিজয়ের দিন।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধ যদি ভারতের বিরুদ্ধে হতো, তাহলে হয়তো ১৬ ডিসেম্বরের আবেগ, প্রতীক ও রাজনৈতিক অর্থ অন্যরকম হতো। কিন্তু ইতিহাসের বাস্তবতা হলো বাংলাদেশ পাকিস্তানি রাষ্ট্রকাঠামোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে স্বাধীন হয়েছে। এই সত্যকে অস্বীকার করে কোনো নতুন জাতীয় বয়ান তৈরি করা সম্ভব হতে পারে, কিন্তু সেটি ইতিহাস হবে না।
ইতিহাসকে সাময়িকভাবে চুপ করানো যায়। স্মারক সরানো যায়। নাম বদলানো যায়। ছবি নামানো যায়। স্লোগান নিষিদ্ধ করা যায়। পাঠ্যবই পাল্টানো যায়। কিন্তু ইতিহাসকে হত্যা করা যায় না। কারণ ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর বৈশিষ্ট্য হলো তাকে যত চাপা দেওয়া হয়, কোনো না কোনো প্রজন্ম তত বেশি জিজ্ঞেস করে, ‘কেন?’
কেন ১৬ ডিসেম্বরের স্মৃতি অস্বস্তিকর? কেন পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের দৃশ্য আড়াল করতে হবে? কেন ‘জয় বাংলা’ ভয় পাওয়ার শব্দ হবে? কেন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে এমনভাবে পুনর্বিন্যাস করতে হবে, যেখানে স্বাধীনতার বিরোধিতাও ধীরে ধীরে কেবল আরেকটি ‘রাজনৈতিক মত’ হয়ে যায়? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন যদি মুক্তিযুদ্ধের ‘ব্যবসা’ এতটাই অপ্রয়োজনীয় হয়ে থাকে, তাহলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের প্রয়োজনীয়তা কেন এত অস্বস্তিকর হয়ে উঠছে?
সময়ের সঙ্গে হয়তো ক্ষমতার চেয়ারে আওয়ামী লীগ বদলাবে, বিএনপি বদলাবে, নতুন দল আসবে, নতুন প্রজন্ম আসবে। কিন্তু ১৯৭১ বদলাবে না। ১৯৭১ কোনো দলের নির্বাচনী ইশতেহার নয়। ১৯৭১ বাংলাদেশের জন্মসনদ। সেই জন্মসনদ থেকে বাবার নাম মুছে ফেললে কাগজটি হয়তো নতুন করে ছাপা যায়, কিন্তু সন্তানটির জন্মের ইতিহাস বদলায় না।
আর যে জাতি নিজের স্বাধীনতার ইতিহাসকে লজ্জার বস্তু বানাতে শুরু করে, একদিন সে স্বাধীনতার অর্থটাই ভুলে যেতে পারে। তাই লড়াইটা কোনো দলের জন্য নয়। লড়াইটা স্মৃতির বিরুদ্ধে বিস্মৃতির, ইতিহাসের বিরুদ্ধে ইতিহাসহীনতার। আর শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই পরাজিত পাকিস্তানি বাহিনীর পরাজয়ের স্মৃতি মুছে ফেলতে ফেলতে আমরা কি একদিন বাংলাদেশের বিজয়ের স্মৃতিটাই মুছে ফেলব?
স্বাধীনতা অর্জনের কীর্তিমানদের স্বরণ আর বরণে কেবলমাত্র আওয়ামী লীগই ধারক আর বাহক; বারবার এটাই প্রমাণ করেই যাচ্ছে এই বিএনপি-জামায়াত জোট।
এখন বাকিটা জনগণের প্রতিরোধ বা প্রতিবিম্বন।
জয় বাংলা।।
আদিত্য প্রতাপ ঘোষ
লেখক, ব্লগার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক


