উচ্চশিক্ষা শেষ করেও কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থান মিলছে না- বাংলাদেশের তরুণদের জন্য শ্রমবাজারের এই বাস্তবতা দিন দিন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দক্ষিণ এশিয়ায় উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বের হার উদ্বেগজনকভাবে বেশি। বাংলাদেশে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ৩৬ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি ১০০ জন উচ্চশিক্ষিত তরুণের মধ্যে প্রায় ৩৬ জনই কর্মহীন।
আইএমএফের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এশিয়ার বিভিন্ন দেশে তরুণদের বেকারত্বের চাপ থাকলেও সবচেয়ে বেশি শিক্ষিত তরুণদের মধ্যেই অনেক ক্ষেত্রে বেকারত্বের হার তুলনামূলক বেশি। দক্ষিণ এশিয়ার পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। বাংলাদেশে এই হার প্রায় ৩৬ শতাংশ থেকে শ্রীলঙ্কায় প্রায় ৪৩ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে।
আইএমএফের বিশ্লেষণে বাংলাদেশের শ্রমবাজারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা হিসেবে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে অসামঞ্জস্য বা education-occupation mismatch তুলে ধরা হয়েছে। সংস্থাটির জানুয়ারি ২০২৬-এর বাংলাদেশবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়, শিক্ষার প্রসার যে হারে হয়েছে, সেই তুলনায় উচ্চ উৎপাদনশীল খাতে কর্মসংস্থান বাড়েনি। ফলে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের ক্রমবর্ধমান অংশের জন্য মানসম্মত চাকরির সুযোগ পর্যাপ্ত হচ্ছে না।
আইএমএফের ভাষায়, এই পরিস্থিতি অনেকটা ‘গ্র্যাজুয়েট গ্লাট’- অর্থাৎ উচ্চশিক্ষিত গ্র্যাজুয়েটের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু তাদের যোগ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ চাকরির সৃষ্টি সেই অনুপাতে হচ্ছে না। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে এই সমস্যা আরও প্রকট।
দেশটির ২০২৪ সালের শ্রমবাজারের তথ্য বিশ্লেষণ করে আইএমএফ জানিয়েছিল, উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বের হার প্রায় ২৫ শতাংশ ছিল- যা কম শিক্ষিত তরুণদের তুলনায় তিন গুণেরও বেশি। একই প্রতিবেদনে উচ্চশিক্ষিত নারীদের বেকারত্বও পুরুষদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি বলে দেখানো হয়েছে।
সমস্যাটির পেছনে কেবল চাকরির সংখ্যা কম থাকা নয়; শিক্ষাব্যবস্থা ও শিল্পের প্রয়োজনের মধ্যকার দূরত্বও বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। আইএমএফ বলছে, উচ্চশিক্ষা থেকে অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতার সঙ্গে নিয়োগদাতাদের প্রয়োজনীয় দক্ষতার মিল না থাকলে শিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থানে প্রবেশ কঠিন হয়ে পড়ে।
সংস্থাটি শিল্পের বহুমুখীকরণ, উচ্চ উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ, দক্ষতা উন্নয়ন, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে শক্তিশালী সংযোগ এবং কর্মমুখী প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। বিশেষ করে প্রযুক্তিনির্ভর ও উচ্চমূল্যের নতুন খাত তৈরি না হলে শিক্ষিত তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি কঠিন হবে বলে আইএমএফের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
এরই মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই শ্রমবাজারের চিত্র আরও দ্রুত বদলে দিচ্ছে। আইএমএফের সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর বিশ্লেষণে সতর্ক করা হয়েছে, এআই উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে পারে; তবে প্রযুক্তি গ্রহণের গতি যদি কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধির চেয়ে দ্রুত হয়, তাহলে তরুণদের শ্রমবাজারে নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।
তবে এআইয়ের প্রভাবকে শুধু চাকরি হারানোর ঝুঁকি হিসেবে দেখছে না আইএমএফ। সংস্থাটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রযুক্তি উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগ, ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং নতুন ধরনের কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি করতে পারে। এজন্য তরুণদের নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর মতো দক্ষতা অর্জন জরুরি।
উচ্চশিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থানের এই সংকট শুধু ব্যক্তিগত বেকারত্বের সমস্যা নয়; এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি ও ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড কাজে লাগানোর সক্ষমতার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। আইএমএফ বলছে, তরুণ ও শিক্ষিত জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানে যুক্ত করতে না পারলে মানবসম্পদে বিনিয়োগের প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া কঠিন হবে।
ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বা সনদধারীর সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি কোন ধরনের দক্ষতার চাহিদা রয়েছে, কোন খাতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে এবং শিক্ষার্থীরা সেই চাকরির জন্য কতটা প্রস্তুত- এই তিনটি প্রশ্নকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
বাংলাদেশের জন্য বার্তাটি স্পষ্ট: উচ্চশিক্ষিত তরুণের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু সেই তরুণদের জন্য উপযুক্ত কর্মসংস্থান তৈরির গতি যদি সমানভাবে না বাড়ে, তাহলে শিক্ষিত বেকারত্ব দেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।


