বাংলাদেশ-নেপাল-ভুটানমুখী যোগাযোগের পাশাপাশি কৌশলগত ‘বিকল্প পথ’ গড়ে তুলছে দিল্লি
বাংলাদেশের সীমান্তসংলগ্ন ভারতের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিলিগুড়ি করিডোর পরিচিত ‘চিকেনস নেক’ নামে- নতুন করে অবকাঠামোগত গুরুত্ব পাচ্ছে। এই কৌশলগত অঞ্চলে ৩১.০২ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সড়ক চার লেনে উন্নীত করতে ২ হাজার ৭৭ কোটি ১৮ লাখ রুপি অনুমোদন করেছে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে জাতীয় মহাসড়ক-৩২৭-এর বাগডোগরা-পানিটাঙ্কি-খড়িবাড়ি-গালগালিয়া অংশে।
ভারতের সড়ক পরিবহন ও মহাসড়কমন্ত্রী নিতিন গড়করি ৩ সেপ্টেম্বর প্রকল্পটির অনুমোদনের কথা জানান। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চার লেনের এই মহাসড়কে থাকবে তিনটি বড় সেতু, একটি রোড ওভারব্রিজ (আরওবি), পাঁচটি হাতি চলাচলের আন্ডারপাস এবং উভয় পাশে সার্ভিস রোড।
ভারতের মূল ভূখণ্ডকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করা সংকীর্ণ স্থলপথ শিলিগুড়ি করিডোর। পশ্চিমবঙ্গের এই করিডোরের অবস্থান এমন এক অঞ্চলে, যার একদিকে নেপাল ও বাংলাদেশের সীমান্ত এবং কাছাকাছি রয়েছে ভুটান ও চীনের সীমান্ত। ফলে ভারতের যোগাযোগ, বাণিজ্য ও নিরাপত্তার দৃষ্টিতে অঞ্চলটির গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি।
নতুন NH-327 মূলত বিদ্যমান জাতীয় মহাসড়ক-২৭-এর একটি বিকল্প ও সমান্তরাল যোগাযোগপথ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। প্রকল্পের চার লেনের অংশটি বাগডোগরা থেকে পানিটাঙ্কি, খড়িবাড়ি হয়ে বিহারের গালগালিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। গালগালিয়া নেপাল সীমান্তের কাছাকাছি গুরুত্বপূর্ণ একটি যোগাযোগকেন্দ্র।
প্রকল্পটি উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশের দিকে আঞ্চলিক যোগাযোগ উন্নত করবে। একই সঙ্গে বাগডোগরা বিমানবন্দর এবং উত্তরবঙ্গের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে সড়ক যোগাযোগও সহজ হবে।
চার লেনের সড়ক নির্মাণের ফলে বাগডোগরা, নকশালবাড়ি, খড়িবাড়ি ও পানিটাঙ্কি এলাকায় যানজট কমানোর লক্ষ্য রয়েছে। একই সঙ্গে কৃষি, উদ্যানপালন, চা ও অন্যান্য স্থানীয় পণ্য দ্রুত বড় বাজারে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হবে বলে জানিয়েছে ভারত সরকার।
অর্থাৎ, প্রকল্পটির প্রভাব শুধু যাত্রী চলাচলে সীমাবদ্ধ থাকবে না; উত্তরবঙ্গ ও উত্তর-পূর্ব ভারতের পণ্য সরবরাহ ও লজিস্টিক ব্যবস্থার সক্ষমতাও বাড়তে পারে।
প্রকল্পটির অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হলো বন্যপ্রাণী সুরক্ষার ব্যবস্থা। পাঁচটি বিশেষ হাতি আন্ডারপাস নির্মাণ করা হবে, যাতে মহাসড়ক পারাপারের সময় দ্রুতগতির যানবাহনের সঙ্গে হাতির সংঘর্ষের ঝুঁকি কমে। পাশাপাশি নির্মাণ করা হবে তিনটি বড় সেতু, একটি রোড ওভারব্রিজ এবং সার্ভিস রোড।
শিলিগুড়ি করিডোর ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে দেশের বাকি অংশের স্থল যোগাযোগের অন্যতম প্রধান লাইফলাইন। ফলে এখানে একটি বিকল্প চার লেনের মহাসড়ক তৈরি হলে কোনো একটি প্রধান সড়কে চাপ বা যোগাযোগে বিঘ্ন দেখা দিলে অতিরিক্ত সড়ক সক্ষমতা কাজে লাগানো সম্ভব হবে।
এ কারণেই অবকাঠামো বিশেষজ্ঞদের কাছে NH-327-এর উন্নয়নকে কেবল স্থানীয় সড়ক সম্প্রসারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে না। বরং এটি উত্তরবঙ্গ, উত্তর-পূর্ব ভারত এবং নেপাল-ভুটান-বাংলাদেশমুখী আঞ্চলিক যোগাযোগ নেটওয়ার্কের সক্ষমতা বাড়ানোর বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিলিগুড়ি করিডোরে সড়ক ও রেল অবকাঠামো শক্তিশালী করার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে ভারত। নতুন মহাসড়ক প্রকল্প সেই ধারাবাহিকতাকেই আরও বিস্তৃত করছে। ফলে বাংলাদেশের সীমান্তের অদূরে অবস্থিত এই সংকীর্ণ ভূখণ্ডটি ভারতের যোগাযোগ ও কৌশলগত অবকাঠামো পরিকল্পনায় যে ক্রমেই আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, নতুন প্রকল্পটি তারই স্পষ্ট ইঙ্গিত।


