আদিত্য প্রতাপ ঘোষের কলাম
ইতিহাসের নারকীয় অধ্যায়কাল থাকে, সেগুলোর তপ্ততায় পুড়ে যায় শান্তি, শৃঙ্খলা আর সম-লোকাচার। যেগুলোর সম্যক দৃশ্য ভেসে উঠলেই মানুষের বুক কেঁপে ওঠে, রাগে,ক্ষোভে আর হতবিহবলতায়। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট বাংলাদেশের জন্য ঠিক তেমনই এক রোমহষর্ক নিষ্ঠুরতম অধ্যায়। এমন এক অধ্যায়, যার প্রতিটি অনুপ্রাস রক্তে লেখা, প্রতিটি অনুচ্ছেদ কান্নায় ভেজা, প্রতিটি স্মৃতি আতঙ্ক আর বেদনার রক্তাক্ততায়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে শেখ হাসিনার সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এরপরই বাংলাদেশ প্রবেশ করে এক ভয়াবহ অস্থিরতার সময়ের মধ্যে। আইনের শাসন ভেঙে পড়ে, নিরাপত্তাব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে যায়, শুরু হয় প্রতিশোধ, সহিংসতা এবং নৃশংসতার সর্বোচ্চ কালো অন্ধকার অধ্যায়। গত ৫ই অগাস্ট, ২০২৪-এ বাংলাদেশে দেশী বিদেশী ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে জঙ্গী আক্রমণ করে শেখ হাসিনার সরকার হটিয়ে দেয়া হয়। এরপর বাংলাদেশে নেমে আসে সর্বোচ্চ জাহেলিয়াত। খুন, গুম, পুড়িয়ে দেয়া, লাশের দীর্ঘ সারি, ধর্ষণ আর আইনের সবচেয়ে করুণ বেহাল দশায় যায় বাংলাদেশ। ইতিহাসের সবচেয়ে কলংকজনক অধ্যায়ে প্রবেশ করে বাংলাদেশ। সবচেয়ে নির্মম গণহত্যা চালানো হয় রাষ্ট্রের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ বাহিনীর ওপরে। প্রায় ৩২০০’র অধিক পুলিশ সদস্যকে।নির্মমভাবে হত্যা করে জঙ্গীরা সভ্যতার এতশত শতাব্দীতে কখনোই একটা রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ওপরে এরকম নির্মম মর্মন্তুদ গণহত্যা চালানো হয়নি আগে। থানার ভেতরে পুলিশকে গণহত্যা করা হয়, পুলিশ সদস্যদের হত্যা করে ঝুলিয়ে দিয়ে উল্লাস করা হয়, লুট করা হয় পুলিশের অস্ত্র। খুঁচিয়ে হত্যা করা হয় তাদের। এমনকি নারী পুলিশ সদস্যরা রেহাই পায়নি গণহত্যা থেকে। গর্ভবতী নারী পুলিশদেরও বেয়নেট দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়, আকুতিভরা হাতজোড়ে প্রাণ ভিক্ষা চাওয়ার পরেও তাদেরকে হত্যা করা হয়।
জুলাইয়ের কালো ঘনান্ধকারের সবচেয়ে করুণ প্রাণ হারানোর তালিকার শীর্ষে রয়ে গেলো বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী পুলিশ সদস্যরা। বাংলাদেশ পুলিশ, রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। যে বাহিনী প্রতিদিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করে, যে বাহিনীর সদস্যরা ঈদে বাড়ি যেতে পারেন না, সন্তানের জন্মদিনে উপস্থিত থাকতে পারেন না, নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অন্যের জীবন রক্ষা করেন, সেই পুলিশ বাহিনীর ওপর নেমে আসে ইতিহাসের জঘন্যতম ভয়াবহ গণহত্যা।
বাংলাদেশের ইতিহাসে রাজনৈতিক সংঘাত নতুন নয়। কিন্তু একটি রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সদস্যদের থানার ভেতরে হত্যা, জীবন্ত পুড়িয়ে দেওয়া, পিটিয়ে মেরে ফেলা, লাশ ঝুলিয়ে উল্লাস করা, অস্ত্রাগার লুট করা এবং নিহতদের মরদেহ অবমাননার মতো দৃশ্য এর আগে কখনোই দেখা যায়নি। সেদিন শুধু পুলিশ সদস্যদের গণহত্যা করা হয়নি, সেদিন রাষ্ট্রের কর্তৃত্বকে হত্যা করা হয়েছিল। সেদিন আইনের শাসনকে হত্যা করা হয়েছিল। সেদিন পুলিশের ইউনিফর্মকে অপমান করা হয়েছিল। যে কনস্টেবলটি সকালে ডিউটিতে গিয়েছিল, সে কি জানতো রাত নামার আগেই তার স্ত্রী বিধবা হবে!যে এসআইটি সন্তানের স্কুলের বেতন দেওয়ার হিসাব করছিল, সে কি জানত কয়েক ঘণ্টা পর তার নিথর দেহ পড়ে থাকবে কোনো থানার ধ্বংসস্তূপে? যে নারী পুলিশ সদস্যটি দেশের দায়িত্ব পালন করছিলেন, তিনি কি জানতেন তার ইউনিফর্মও তাকে রক্ষা করতে পারবে না? নারী পুলিশ সদস্যরাও রেহাই পাননি সেই উন্মত্ত জঙ্গীদের করাল হিংস্র গ্রাস থেকে। এমনকি গর্ভবতী নারী পুলিশ সদস্যদের ওপরও নির্মমভাবে হত্যা করা হল। সেই সময়ের অসংখ্য ছবি, ভিডিও এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা আজও মানুষের গায়ে কাঁটা দেয়। কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, এই হত্যাকাণ্ডের রক্ত শুধু নিহতদের পরিবারকে কাঁদায়নি; এটি পুরো পুলিশ বাহিনীর আত্মাকে ক্ষতবিক্ষত করেছে।
উদ্দেশ্যের বাস্তবিকতা হচ্ছে ২০২৪ সালের ৫ থেকে ৮ আগস্টের সেই রক্তাক্ত দিনগুলোর পর থেকে বাংলাদেশ পুলিশের আগের সেই স্বরুপ আর নেই। পুলিশ বাহিনীর সমস্ত কিছু বাইরে থেকে হয়তো আগের মতোই আছে। থানাগুলো খুলেছে, টহল চলছে, মামলা হচ্ছে, গ্রেপ্তার হচ্ছে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে আগুনপোড়া ক্ষতের যন্ত্রণা নিয়ে তারা মুখবুজে কাজ করছে।কাউকে কিছুই বলছেনা। সবচেয়ে বড় অংশের গণহত্যার শিকার হয়েছে কনস্টেবল এবং এসআইদের ওপর দিয়ে। নিহতরা ছিল তাদের সহকর্মী। একই ব্যারাকে থাকা মানুষ। একই টেবিলে বসে খাওয়া বন্ধুপরিজন। রাত জেগে একসঙ্গে ডিউটি করা সহকর্মী। একসঙ্গে বাঁচতে চাওয়া উজ্জ্বল উচ্ছ্বল মানুষেরা। আজ যখন তারা নিহত সহকর্মীদের ছবি দেখেন, সেইসব হত্যার পরে জল্লাদের প্রকাশ্য হাসি।দেখেন, তখন তারা কোনো সংবাদ দেখতে চান না। তাঁরা নিজের ভবিষ্যৎ দেখেন। তারা ভাবেন, “সেদিন আমি ওখানে থাকলে হয়তো লাশটা আমার হতো।”
বহু পর্যবেক্ষকের মতে, পুলিশ বাহিনীর মনোবল আজও পুরোপুরি পুনর্গঠিত হয়নি। মূলত জঙ্গীদের এটাই লক্ষ্য ছিল।
অনেক সদস্য চাকরি করছেন, দায়িত্ব পালন করছেন, কিন্তু সেটা যেন শুধুই চাকরি বাঁচানোর তাগিদে। রাষ্ট্রের জন্য জীবন উৎসর্গ করার যে মানসিক শক্তি একজন পুলিশ সদস্যকে সাহসী করে তোলে, সেই জায়গাটিতেই সবচেয়ে বড় ক্ষত তৈরি হয়েছে। আর সেই ক্ষতের কেন্দ্রে আছে একটি প্রশ্ন, ‘আমাদের সহকর্মীদের হত্যার বিচার কোথায়?’ পুলিশের সকল পর্যায়ের সদস্যেদের মধ্যে এই অনুভূতি কাজ করে যে, যাদের সঙ্গে তারা বছরের পর বছর কাজ করেছেন, যাদের সঙ্গে সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করেছেন, যাদের সঙ্গে এক প্লেটে খেয়েছেন, তাদের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচার এখনও দৃশ্যমান নয় কেন? ফলে তাদের কাছে রাজনৈতিক মতাদর্শের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে বিচার পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। তাদের কাছে দল নয়, মুখ্য হয়ে উঠেছে নিহত সহকর্মীদের স্মৃতি। ক্ষমতার দাস হয়ে সমীকরণ মেলানো নয়, মুখ্য হয়ে উঠেছে রক্তের হিসাব।
পুলিশের একাধিক সদস্যদের সাথে কথা বলে জানা গেছে যদি কখনও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি হয়, যদি এই হত্যাকাণ্ডের প্রশ্ন আবার জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে আসে, তাহলে বিচার পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। এই কারণেই পুলিশের একটি অংশের চিন্তা-চেতনায় পরিবর্তন এসেছে বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে। মানুষ শেষ পর্যন্ত রাজনীতির জন্য কাঁদে না। মানুষ কাঁদে তার বন্ধুর জন্য। তার সহকর্মীর জন্য। তার পাশে বসে খাওয়া মানুষটির জন্য। তার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করা মানুষটির জন্য।
আজ জুলাইয়ের সেই আগুন নিভে গেছে। ভাঙা থানাগুলো মেরামত হয়েছে। পোড়া দেয়ালগুলো নতুন রং পেয়েছে। কিন্তু পুলিশের বুকের ভেতরের পোড়া দাগ এখনও শুকায়নি। সেই দাগ নিয়ে তারা প্রতিদিন ডিউটিতে যায়। সেই দাগ নিয়ে রাত জাগে। সেই দাগ নিয়ে সন্তানকে কোলে নেয়। সেই দাগ নিয়েই তারা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষা করে। কিন্তু বুকের ভেতরে এখনও একটি প্রশ্ন রয়ে গেছে। একটি প্রশ্ন, যার উত্তর তারা এখনও পায়নি।
“আমাদের সহকর্মীদের রক্তের বিচার কি কোনোদিন হবে?”
ইতিহাসের আদালত হয়তো একদিন সেই উত্তর দেবে। কিন্তু ততদিন পর্যন্ত জুলাইয়ের সেই রক্তাক্ত স্মৃতি বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনীর বুকের ভেতর এক নীরব কান্না হয়ে বেঁচে থাকবে।
খুব কাছ থেকে শতাধিক পুলিশ সদস্য কোনো প্রকার রাকঢাক না রেখেই জানিয়েছে, জঙ্গী হামলায় ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর কোনো অ্যাকশন নিতে তাদের ভেতর থেকে কোনো ইচ্ছা কাজ করে না; বরঙ অনেক পুলিশ সদস্যই মনে মনে চান আওয়ামী লীগ রাজপথে নামুক, চাপ সৃষ্টি করুক। কারণ তাঁরা ইচ্ছা পোষণ করেন যেসব সহকর্মীদের সাথে তারা এক টেবিলে বসে খেয়েছেন, গল্প করেছেন, তাদের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচার হোক। রাজপথে চাপ তৈরি হলে বর্তমানে দায়িত্বে থাকা উর্ধ্বতন বিসিএস কর্মকর্তাদের ওপরও একটা পরিস্থিতি তৈরি হবে।
স্পষ্টতই, নিজেদের সহকর্মীদের ওপর হওয়া অন্যায়ের বিচার পাওয়ার আশায় পুলিশের একটা বড় অংশ, বিশেষ করে মাঠপর্যায়ের কনস্টেবল ও এসআইরা খোলনলচে এখন আওয়ামী লীগের সমর্থক হয়ে উঠেছে, এটা ধ্রুবসত্য। গণহত্যার নির্মম শিকার হওয়া পুলিশ সদস্যদের সহকর্মীরা কার্যত এই বিচারের আশায় দীর্ঘ অপেক্ষা করছেন। তাদের বিশ্বাস, বাংলাদেশ দ্রুত ঘুরে দাঁড়াবে, বাংলাদেশে বাংলাদেশপন্থী সরকার আবার দ্রুত ক্ষমতায় আসবে, এবং প্রতিটি পুলিশ হত্যার সুবিচার হবেই।
এখন অন্তবিহীন অপেক্ষা তাদের সূর্যদীঘল ভেজা চোখে প্রশ্নের প্রয়াণে সাহসের দীপ্ত অভিযোজন, ”প্রভাত কত নিকটে আর?”
আদিত্য প্রতাপ ঘোষ
লেখক, ব্লগার, সাংবাদিক
রাজনৈতিক বিশ্লেষক।।


