মাদারীপুরে জন্ম, কলকাতায় বেড়ে ওঠা। মাত্র ১২ বছর বয়সে সাইকেল, ১৬-তেই জিপ চালিয়ে সবাইকে চমকে দেওয়া। এরপর পুরুষপ্রধান প্রকৌশল শিক্ষায় প্রবেশ করে ইতিহাস সৃষ্টি। শুধু নিজে প্রকৌশলী হয়েই থেমে থাকেননি- নারীদের কারিগরি শিক্ষার পথ খুলে দিতে প্রতিষ্ঠা করেছেন পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট। তিনি ইলা (মজুমদার) ঘোষ- বাংলার নারী প্রকৌশল শিক্ষার এক বিস্মৃত অগ্রদূত।
১৯৩০ সালের ২৪ জুলাই তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের ফরিদপুর জেলার মাদারীপুর মহকুমায় জন্মগ্রহণ করেন ইলা ঘোষ। তাঁর বাবা যতীন্দ্র কুমার মজুমদার ছিলেন অবিভক্ত বাংলার সিভিল সার্ভিসের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। কর্মসূত্রে বাবার বদলি হওয়ায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় তাঁর শৈশব ও শিক্ষাজীবন কাটে।
তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজব্যবস্থায় মেয়েদের জন্য নানা বিধিনিষেধ থাকলেও ইলার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াননি তাঁর বাবা। বরং মেয়েকে সবসময় উৎসাহ দিয়েছেন। সেই সাহসেই মাত্র ১২ বছর বয়সে সাইকেল চালানো শেখেন ইলা। ১৬ বছর বয়সে জিপ গাড়ি চালিয়ে তিনি চারপাশের মানুষকে তাক লাগিয়ে দেন। খুলনার একটি স্কুলে নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করার পর দেশভাগের সময় তাঁর পরিবার কলকাতায় চলে যায়। ১৯৪৬ সালে প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হিসেবে দ্বিতীয় বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করেন তিনি। পরে কলকাতার আশুতোষ কলেজে ভর্তি হয়ে প্রথম বিভাগে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন।
ভারত স্বাধীন হওয়ার পর নারীদের জন্য প্রকৌশল শিক্ষার দরজা খুলে যায়। ইলা ঘোষ ইঞ্জিনিয়ারিং ও মেডিকেল- দুই প্রবেশিকা পরীক্ষাতেই উত্তীর্ণ হন। শেষ পর্যন্ত তিনি বেছে নেন প্রকৌশলকে। ১৯৪৮ সালে শিবপুরের বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হন তিনি। তাঁর ইচ্ছা ছিল সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার। কিন্তু মাঠপর্যায়ে কাজ করতে হবে- এই যুক্তিতে কলেজ কর্তৃপক্ষ তাঁকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হতে দেয়নি। বাধ্য হয়ে তিনি মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হন।
তখন প্রকৌশল শিক্ষা ছিল প্রায় পুরোপুরি পুরুষদের দখলে। কলেজে ইলা ছিলেন বিরল ব্যতিক্রম। তাঁর সঙ্গে অজন্তা গুহ নামের আরেক নারী শিক্ষার্থীও ভর্তি হয়েছিলেন। তবে অজন্তা মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দিলে ইলাই হয়ে ওঠেন কলেজের একমাত্র নারী শিক্ষার্থী। ছাত্রীনিবাস না থাকায় প্রতিদিন দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে, এমনকি নদী পার হয়েও তাঁকে কলেজে যাতায়াত করতে হতো। সামাজিক কটূক্তি, বৈষম্য ও নানা প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে তিনি পড়াশোনা চালিয়ে যান।
১৯৫১ সালে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিগ্রি অর্জন করে ইলা ঘোষ ইতিহাসে জায়গা করে নেন। তিনি পূর্ব ও পশ্চিম বাংলার বাঙালি নারীদের মধ্যে প্রথম দিককার নারী প্রকৌশলী এবং প্রথম বাঙালি নারী মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
স্নাতক হওয়ার পর উচ্চশিক্ষার জন্য স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোয় যান ইলা ঘোষ। সেখানে ‘বার অ্যান্ড স্ট্রাউড’ (Barr & Stroud) প্রতিষ্ঠানে অপটিক্যাল প্রযুক্তি ও রেঞ্জফাইন্ডার-সংক্রান্ত উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ইউরোপের বিভিন্ন শিল্পকারখানা পরিদর্শনের মাধ্যমে অর্জন করেন বাস্তবভিত্তিক কারিগরি জ্ঞান। বিদেশে উচ্চতর প্রকৌশল শিক্ষা গ্রহণকারী প্রথম দিককার বাঙালি নারী শিক্ষার্থীদের মধ্যেও তাঁর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
দেশে ফিরে ভারতের দেরাদুনের অর্ডিন্যান্স ফ্যাক্টরির ভারী যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানায় কর্মজীবন শুরু করেন। পরে ১৯৫৫ সালে দিল্লি পলিটেকনিক কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। সেখানে শিক্ষকতার পাশাপাশি প্রকৌশল বিষয়ে দুটি বইও লেখেন- Applied Mechanics Through Worked Examples এবং Hydraulics Through Worked Examples। ১৯৫৯ সালের পর কলকাতায় ফিরে তিনি ইনস্টিটিউট অব জুট টেকনোলজিতে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন।
ইলা ঘোষের সবচেয়ে বড় অবদান ছিল নারী কারিগরি শিক্ষার প্রসারে। ১৯৬৩ সালের ২৩ ডিসেম্বর কলকাতার গড়িয়াহাট রোডে পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দেন তিনি। প্রতিষ্ঠানটির প্রথম অধ্যক্ষও হন তিনি। তাঁর এই অসামান্য কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কোর একটি প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশে নারী কারিগরি শিক্ষার প্রসারে কাজ করার দায়িত্ব পান ইলা ঘোষ।
সেই দায়িত্ব নিয়ে তিনি ঢাকায় আসেন এবং বাংলাদেশের প্রথম মহিলা পলিটেকনিক কলেজ প্রতিষ্ঠার কাজে নেতৃত্ব দেন। শুরুতে পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁকে অধ্যক্ষের পদ থেকে অব্যাহতি দিতে অনিচ্ছুক থাকলেও শেষ পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশে এসে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
মাত্র ১২ জন শিক্ষক ও প্রায় ৭০ জন ছাত্রী নিয়ে আর্কিটেকচার ও ইলেকট্রিক্যাল বিভাগ চালুর মাধ্যমে শুরু হয় ঢাকা মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের পথচলা। প্রতিষ্ঠানটির শুধু শিক্ষাব্যবস্থা নয়, এর অবকাঠামো, সিলেবাস, বইয়ের তালিকা, বই কেনা, আসবাবপত্র সংগ্রহ থেকে শুরু করে প্রশাসনিক কার্যক্রম- সবকিছুর সঙ্গেই সরাসরি যুক্ত ছিলেন ইলা ঘোষ। এমনকি কোথায় কোন ভবন হবে, সেটিও নির্ধারণে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। পরবর্তীতেও তিনি প্রতিষ্ঠানটির উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
একসময় বাংলাদেশের মেয়েদের জন্য এটিই ছিল সর্বোচ্চ পর্যায়ের কারিগরি শিক্ষার অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান। অথচ যে নারী নিজের শ্রম, মেধা ও নেতৃত্ব দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির ভিত্তি গড়ে দিয়েছিলেন, সময়ের সঙ্গে সেই ইলা ঘোষই যেন হারিয়ে গেছেন ইতিহাসের আড়ালে। ঢাকা মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের কোথাও তাঁর নামে স্মারক ফলক, কক্ষ, লাইব্রেরি কিংবা ল্যাবরেটরি নেই- এমনকি তাঁর অবদানের দৃশ্যমান স্মৃতিচিহ্নও খুবই অপ্রতুল।
ইলা ঘোষ শুধু একজন প্রকৌশলী ছিলেন না; তিনি ছিলেন নারী শিক্ষার এক সাহসী পথপ্রদর্শক। যে সময়ে মেয়েদের প্রকৌশল পড়াকে সমাজ স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করত না, সেই সময়ে তিনি পুরুষপ্রধান শিক্ষাঙ্গনে দাঁড়িয়ে নিজের জায়গা তৈরি করেছিলেন। পরে সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে অসংখ্য নারীর জন্য কারিগরি শিক্ষার দরজা খুলে দেন।
ভারতের খ্যাতিমান প্রকৌশলী ও সহপাঠী অসীম ঘোষের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। কর্মজীবনের পাশাপাশি সামাজিক ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডেও যুক্ত ছিলেন তিনি। দীর্ঘ কর্মময় জীবন শেষে ২০১৯ সালের ১১ ডিসেম্বর কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন ইলা ঘোষ।
তাঁর জীবন যেন এক অনন্য বার্তা- একজন নারী যখন নিজের জন্য বন্ধ দরজা ভেঙে পথ তৈরি করেন, সেই পথ পরবর্তী প্রজন্মের অসংখ্য নারীর জন্যও সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়। অথচ এমন এক পথিকৃৎ আজও বাংলাদেশের নারী কারিগরি শিক্ষার ইতিহাসে যথাযথভাবে স্মরণীয় হয়ে ওঠেননি।


