জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলায় কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্দেশ্যে নেওয়া দুটি খাল খনন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম, নীতিমালা লঙ্ঘন এবং শ্রমিক বঞ্চনার অভিযোগ উঠেছে। যে প্রকল্পে স্থানীয় শ্রমিকদের কাজ দিয়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করার কথা ছিল, সেখানে অধিকাংশ খননকাজই করা হয়েছে ভেকু (এক্সকাভেটর) মেশিন দিয়ে। ফলে শত শত দরিদ্র শ্রমিক কাজ থেকে বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি প্রকল্পের নকশা অনুযায়ী কাজ না হওয়ায় সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন (পিআইও) কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, আদারভিটা ইউনিয়নের পলিশা খাল খননের জন্য ১ কোটি ২৭ লাখ ৪৪ হাজার ৭১০ টাকা এবং চরপাকেরদহ ইউনিয়নের তেঘরিয়া খাল খননের জন্য ১ কোটি ১৫ লাখ ৯ হাজার ৮৩০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কর্মসৃজন কর্মসূচির আওতায় প্রকল্প দুটি বাস্তবায়নের কথা ছিল, যেখানে স্থানীয় শ্রমিকদের নিয়োগ বাধ্যতামূলক ছিল।
প্রকল্প দুটির উদ্বোধন করেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রাশিদুজ্জামান মিল্লাত এবং জামালপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল। উদ্বোধনের সময় তেঘরিয়া খালে প্রতীকীভাবে মাথায় মাটি বহন করে শ্রমনির্ভর প্রকল্পের সূচনা করা হলেও বাস্তবে সেই প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন দেখা যায়নি।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) তাজ উদ্দিন নিজেই স্বীকার করেছেন, শ্রমিকের পরিবর্তে ভেকু মেশিন ব্যবহার করে অধিকাংশ খননকাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। তাঁর দাবি, শ্রমিকদের দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরিতে লোক পাওয়া যায়নি। তাই প্রকল্প কমিটির সিদ্ধান্তে শ্রমিক মজুরির জন্য বরাদ্দের প্রায় ৫০ শতাংশ অর্থ ফেরত পাঠিয়ে ‘নন-ওয়েজ কস্ট’ খাতের অর্থ দিয়ে ভেকু মেশিনে খননকাজ করা হয়।
পলিশা খালের প্রায় ৭৮ শতাংশ এবং তেঘরিয়া খালের ৭৯ শতাংশ কাজ ভেকু মেশিনে সম্পন্ন হয়েছে। অথচ কর্মসৃজন প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যই ছিল বেকার ও নিম্নআয়ের মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা।
এদিকে সরেজমিন পরিদর্শনে প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে সরকারি নকশার বিস্তর অমিল দেখা গেছে। প্রকল্প অনুযায়ী খালের গভীরতা ১০ ফুট, নিচের প্রস্থ ১২ ফুট, ওপরের প্রস্থ ৪০ ফুট এবং দুই পাশে ৫ ফুট করে রাস্তা থাকার কথা ছিল। পাশাপাশি প্রায় দুই হাজার বনজ ও ফলদ গাছ রোপণের পরিকল্পনাও ছিল।
কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, অধিকাংশ স্থানে খালের গভীরতা মাত্র ৬ থেকে ৭ ফুট। নিচের প্রস্থ ৮ থেকে ১০ ফুট এবং ওপরের প্রস্থও নকশার তুলনায় অনেক কম। দুই পাশের রাস্তার প্রস্থ কোথাও মাত্র ১ ফুট, কোথাও দেড় ফুট, আবার কোথাও আড়াই ফুটের বেশি নয়। ফলে প্রকল্পের মান ও টেকসই হওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
শুধু তাই নয়, উপজেলার পশ্চিম পলিশা থেকে দুধিয়াগাছা পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার খাল খননের আরেকটি প্রকল্পেও একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, অতিরিক্ত মাটি কাটার কারণে জনবহুল সড়কের গাইডওয়াল ধসে পড়েছে। এতে সড়কটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে এবং যে কোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। খালের পাড়ে লাগানো অধিকাংশ গাছও ইতোমধ্যে মারা গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা শরাফত বলেন, “এগুলো নিয়ে কথা বলতে গেলেই নানা সমস্যায় পড়তে হয়। আপনারাই এসে দেখে বুঝতে পারছেন, কীভাবে কাজ হয়েছে।”
কোয়ালিকান্দী এলাকার এক শ্রমিক আক্ষেপ করে বলেন, “পরিবার নিয়ে খুব কষ্টে আছি। আশা করেছিলাম খাল খননের কাজে শ্রমিক হিসেবে কাজ পাব। কিন্তু আমাদের বাদ দিয়ে সব কাজ মেশিনে করা হয়েছে।”
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, কর্মসৃজন প্রকল্পে যদি শ্রমিকের পরিবর্তে মেশিনই ব্যবহার করা হয়, তাহলে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য কোথায়? একদিকে দরিদ্র শ্রমিকরা কাজ থেকে বঞ্চিত, অন্যদিকে কোটি টাকার প্রকল্পে নকশা অনুসরণ না করার অভিযোগ-সব মিলিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহারের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।


