বরিশালের সাংবাদিক ও দৈনিক সমকালের সাবেক ব্যুরো প্রধান পুলক চ্যাটার্জীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে পাঁচটি চিরকুট উদ্ধারের পর প্রাথমিকভাবে এটি আত্মহত্যা বলে ধারণা করা হলেও, পুলক চ্যাটার্জীর মৃত্যু খুন নাকি আত্মহত্যা-তা নিশ্চিত করতে তদন্ত করছে পুলিশ। ময়নাতদন্ত ও অন্যান্য তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না।
শুক্রবার সন্ধ্যায় নগরীর প্যারারা রোডে দৈনিক সমকালের বরিশাল ব্যুরো কার্যালয়ের ভেতর থেকে গলায় দড়ি দেওয়া অবস্থায় পুলক চ্যাটার্জীর মরদেহ দেখতে পান স্থানীয়রা। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে অফিসের দরজা ভেঙে মরদেহ উদ্ধার করে। পরে রাত ৯টার দিকে মরদেহটি বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
মরদেহ উদ্ধারের সময় পুলিশ পাঁচটি চিরকুট পেয়েছে বলে জানিয়েছে। চিরকুটগুলোতে পুলক তার স্ত্রী প্রিয়াংকা, মেয়ে প্রকৃতি, ছোট ভাই দীপক ও তার স্ত্রী ইতি, বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসেন, দীর্ঘদিনের সহকর্মী সুমন চৌধুরী এবং প্রশাসনের উদ্দেশ্যে পৃথক বার্তা লিখেছেন।
প্রশাসনের উদ্দেশ্যে লেখা চিরকুটে পুলক নিজের মৃত্যুর জন্য কাউকে দায়ী না করার কথা উল্লেখ করেছেন। দীর্ঘদিনের শারীরিক অসুস্থতা, চিকিৎসার জন্য ভারতে ভেলোর পর্যন্ত যাওয়ার কথা এবং সুস্থ হওয়ার নানা চেষ্টা করেও সফল না হওয়ার বিষয়টি তিনি তুলে ধরেছেন। অসুস্থতার কারণে সামাজিক ও স্বাভাবিক জীবন থেকে পিছিয়ে পড়ার হতাশার কথাও সেখানে রয়েছে।
একই চিরকুটে তিনি প্রশাসনের কাছে তার মরদেহ নিয়ে পরিবারের সদস্যদের যেন হয়রানি করা না হয় এবং দ্রুত পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তরের অনুরোধ করেছেন।
স্ত্রী প্রিয়াংকা ও মেয়ে প্রকৃতির উদ্দেশ্যে লেখা চিরকুটে ক্ষমা চেয়েছেন পুলক। মেয়েকে পড়াশোনা ও গান শেখা চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে মায়ের যত্ন নেওয়ার কথাও লিখেছেন। ছোট ভাই দীপক যেন তাদের পাশে থাকে- সেই অনুরোধও করেছেন।
বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসেনের উদ্দেশে লেখা চিরকুটে পুলক দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব ও স্মৃতির কথা উল্লেখ করেছেন। পরিবারের পাশে থাকার পাশাপাশি তার মরদেহ যেন কোনো ধরনের হয়রানি ছাড়াই পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়, সেই অনুরোধও করেছেন তিনি।
ছোট ভাই দীপক ও তার স্ত্রী ইতির উদ্দেশে লেখা চিরকুটে স্ত্রী ও মেয়েকে আগলে রাখার অনুরোধ জানিয়েছেন পুলক। নিজের কারণে ভাইয়ের ওপর বড় দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়ার জন্য ক্ষমাও চেয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের ভাতা ও ব্যাংক হিসাবসংক্রান্ত বিষয়েও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা লিখেছেন তিনি।
দীর্ঘদিনের সহকর্মী সুমন চৌধুরীর উদ্দেশে লেখা চিরকুটে পুলক প্রায় দেড় যুগ একসঙ্গে কাজ করার স্মৃতি তুলে ধরে কোনো কষ্ট দিয়ে থাকলে ক্ষমা চেয়েছেন। সমকালের কাছে তার পাওনা টাকা আদায় করে তা যেন তার স্ত্রীর হাতে তুলে দেওয়া হয়- এমন অনুরোধও করেছেন।
পাঁচটি চিরকুটে নিজের মৃত্যুর জন্য কাউকে দায়ী না করা, দীর্ঘদিনের অসুস্থতা ও মানসিক হতাশার কথা বলা এবং পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে নির্দেশনা দেওয়ার বিষয়গুলো আত্মহত্যার সম্ভাবনার দিকে ইঙ্গিত করছে। তবে শুধু চিরকুটের ভিত্তিতে মৃত্যুকে চূড়ান্তভাবে আত্মহত্যা হিসেবে ঘোষণা করা যায় না।
মরদেহের অবস্থান, ঘটনাস্থলের আলামত, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, মৃত্যুর সময় এবং অন্যান্য পারিপার্শ্বিক তথ্য বিশ্লেষণের পরই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব। তাই খুনের সম্ভাবনা সম্পূর্ণ নাকচ হয়েছে- এমনটিও এখনই বলা যাচ্ছে না।
বরিশাল মহানগর পুলিশের কমিশনার আবু রায়হান মুহাম্মদ সালেহ জানিয়েছেন, ঘটনাস্থল থেকে সুইসাইড নোট পাওয়া গেছে এবং বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে।
পুলক চ্যাটার্জী দৈনিক সমকালের বরিশাল ব্যুরো প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৩ সালের মে মাসে তিনি চাকরিচ্যুত হন। এরপর থেকে তিনি হতাশায় ভুগছিলেন বলে সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য। মাঝে মধ্যে তিনি সমকাল কার্যালয়ে এসে বসতেন।
বরিশাল প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক পুলক চ্যাটার্জী সংগঠনটির বর্তমান কার্যনির্বাহী কমিটিরও সিনিয়র সদস্য ছিলেন।
একজন সাংবাদিকের কর্মস্থলেই এভাবে তার নিথর দেহ পড়ে থাকা এবং পাশে পরিবারের সদস্য ও সহকর্মীদের উদ্দেশে লেখা পাঁচটি চিরকুট- ঘটনাটিকে আরও হৃদয়বিদারক করে তুলেছে।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- পুলক চ্যাটার্জী কি দীর্ঘদিনের অসুস্থতা ও হতাশার কাছে হার মেনে নিজের জীবন শেষ করেছেন, নাকি এই মৃত্যুর পেছনে অন্য কোনো ঘটনা রয়েছে?
পুলিশের তদন্ত ও ময়নাতদন্তের ফলই শেষ পর্যন্ত সেই প্রশ্নের উত্তর দেবে।


