আদিত্য প্রতাপ ঘোষের কলাম
বাংলাদেশকে একসময় বলা হতো সম্ভাবনার দেশ। আরও পরে, বলা শুরু হয়েছিল সাফল্যের দেশ। দক্ষিণ এশিয়ায় দারিদ্র্য হ্রাস, খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি, নারীর ক্ষমতায়ন, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশের নাম উচ্চারিত হতো আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও। বিদেশি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সংস্থা এবং অর্থনীতিবিদরা বাংলাদেশের অগ্রগতিকে “উন্নয়নের বিস্ময়” বলে অভিহিত করেছিলেন।
মাত্র কয়েক বছর আগেও দেশের মানুষ ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী ছিল। পদ্মা সেতুর মতো বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্প্রসারণ, গ্রামে গ্রামে সড়ক উন্নয়ন, ডিজিটাল সেবার বিস্তার, কৃষি উৎপাদনের বৃদ্ধি সব মিলিয়ে বাংলাদেশ যেন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সামনে এগিয়ে যাচ্ছিল। যে দেশকে স্বাধীনতার পর অবজ্ঞাভরে “তলাবিহীন ঝুড়ি” বলা হয়েছিল, সেই দেশই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে বিশ্বকে দেখিয়েছিল বাংলাদেশ পারে। কিন্তু আজ দেশের পথে-ঘাটে, বাজারে, চায়ের দোকানে, ক্ষেতে-খামারে এবং শ্রমিকের ঘামে ভেজা মুখে অন্য এক দুঃসহনীয় গল্প শোনা যায়। সেই গল্প উন্নয়নের নয়, বরঙ অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখে করুণভাবে বেঁচেবর্তে থাকার গল্প। সেই গল্প পরিসংখ্যানের নয়, সংসারের হাঁড়ির।
আজ দেশের কোটি কোটি পরিবার সকাল শুরু করে এই চিন্তায় ‘দুপুরে কী রান্না হবে?’ দুপুর কাটে এই ভাবনায় ‘রাতের খাবার জুটবে তো?’ বাজারে গেলে মানুষ এখন শুধু দাম শোনে না, দীর্ঘশ্বাসও ফেলে ফিরে আসে। চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজ, সবজি, মাছ, মাংস প্রায় প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে। দোকানে পণ্য আছে, কিন্তু বহু মানুষের পকেটে সেই পণ্য কেনার সামর্থ্য আগের তুলনায় কমে গেছে। অর্থনৈতিক সক্ষমতার ভয়াবহ বিপুল অধপমন আজকে সাধারণ জনগণকে দুর্বিষহ জীবনযাপনে বাধ্য করেছে।
সারা বাংলাদেশের সাধারণ দিনমজুর থেকে মধ্যবিত্ত অব্দি এই গল্প তাই শুধু একটা জনগোষ্ঠীর একক গল্প নয়; এটা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অক্ষমতার চূড়ান্ত প্রমাণ দলিল। বাংলাদেশের কোটি কোটি শ্রমজীবী মানুষের এই করুণ গল্প আজ কান পাতলেই শোনা যায়। যে মানুষটি একদিন কাজ না করলে পরিবারের চুলা জ্বলে না, যার সন্তান টাকার অভাবে কয়েক মাইল হেঁটে স্কুলে যায়, যার কাছে মাছ-মাংস এখন উৎসবের খাবার, তার কষ্ট আসলে একটি বৃহত্তর বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।
শুধু গ্রাম নয়, শহরও চাপের মধ্যে। যে মধ্যবিত্ত পরিবার মাত্র বছর দুয়েক আগেও মাস শেষে কিছু টাকা সঞ্চয় করতে পারত, তারা এখন মাস শেষ হওয়ার আগেই হিসাবের খাতা মিলাতে হিমশিম খায়। সন্তানের পড়াশোনা, বয়স্ক বাবা-মায়ের ওষুধ, সংসারের বাজার সবকিছুর মধ্যে কঠিন সমন্বয় করতে হচ্ছে। অনেক পরিবারে খাবারের তালিকা বদলে গেছে। মাছের জায়গায় সবজি, মাংসের জায়গায় ডাল, ফলের জায়গায় শুধু ভাত। কেউ কেউ তিন বেলার পরিবর্তে দুই বেলা খেয়ে দিন পার করছেন। কেউ নিজের প্রয়োজন কমিয়ে সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছেন। কেউ কেউ একবেলা বিস্কুট আর চা খেয়ে দিনাতিপাত করছে। চূড়ান্ত চিত্র আরো ভয়ংকর। এটাই হয়তো সবচেয়ে বড় সংকেত। কারণ একটি দেশের অর্থনীতির প্রকৃত অবস্থা শুধু জিডিপির হিসাব দিয়ে বোঝা যায় না। বোঝা যায় বাজারে দাঁড়িয়ে একজন শ্রমিকের চোখের দিকে তাকালে। বোঝা যায় একজন মায়ের চিন্তিত মুখে। বোঝা যায় একজন শিক্ষার্থীর অপূর্ণ স্বপ্নে।
দুই বছর আগেও যে বাংলাদেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উন্নয়নের সমাহোরিক ডালি পেতেছিল, আজ সেই বাংলাদেশের বহু মানুষ জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় নিয়ে উদ্বিগ্ন। যে বাংলাদেশ একসময় দারিদ্র্য হ্রাসের উদাহরণ ছিল, আজ সেই দেশেই অনেক পরিবার নতুন করে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। দারিদ্র্যর কষাঘাত আবার।ফিরেছে বাংলাদেশের আনাচে-কানাচেতে। এ কথা সত্য যে বাংলাদেশকে আওয়ামী লীগ খাদ্য উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ সক্ষমতা এনে দিয়েছিল। বাজারে পণ্যের সরবরাহের নিশ্চয়তার ব্যবস্থা করেছিল। কিন্তু সেই খাদ্য বন্টনের সমন্বয়ের বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ এখন সেই খাদ্যেরই চরম ঝুঁকিতে। এহেনতর উল্টো চিত্র মাত্র দুই বছরের মধ্যে ঘটে যাবে- তা কল্পনার বাইরে ছিল।
রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি তার সাধারণ মানুষ। আর সেই মানুষ যখন প্রতিদিন বেঁচে থাকার হিসাব কষতে বাধ্য হয়, তখন রাষ্ট্রের ব্যর্থতা উন্মোচিত হয়। বাংলাদেশের মানুষ সংগ্রামী। এই জাতি দুর্যোগের সঙ্গে লড়েছে, দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়েছে, অসম্ভবকে সম্ভব করেছে। তাই আজও আশা হারিয়ে যায়নি। কিন্তু সেই আশাকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে প্রয়োজন মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের সুযোগ, বাজারে স্থিতিশীলতা এবং এমন একটি অর্থনৈতিক পরিবেশ, যেখানে একজন শ্রমিকের ঘাম, একজন কৃষকের ফসল এবং একজন মধ্যবিত্তের পরিশ্রম সম্মানজনক জীবনের নিশ্চয়তা দিতে পারে। সুস্থ অর্থনৈতিক পরিবেশ, আইনের শাসন আর সুরক্ষা প্রদানকারী সরকার ব্যবস্থাই মুক্তি দেয় চরম দারিদ্র্য থেকে। বাংলাদেশের কাঠামোগত মেরুদণ্ড ভেঙে গেলো মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে। পূর্বতন নির্বাচিত সরকারের ওপর মানুষের বিশ্বাসের ফের প্রতিস্থাপন আর বর্তমান বিএনপি সরকারের ওপর চূড়ান্ত অবিশ্বাস- এই দুইয়ের স্পষ্ট দৃশ্য আজ বাংলাদেশের গ্রামে,গঞ্জে আর জনতার মানসে।
উন্নয়নের সবচেয়ে বড় মাপকাঠি হলো একজন বাবা বাজার থেকে ফিরে সন্তানের মুখে হাসি দেখতে পাচ্ছেন কিনা। একজন মা রান্নার হাঁড়িতে নিশ্চিন্তে ভাত বসাতে পারছেন কিনা। এবং একটি পরিবার আগামীকাল নিয়ে আশাবাদী হতে পারছে কিনা!
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সেই উত্তরেই লুকিয়ে আছে।
আদিত্য প্রতাপ ঘোষ
লেখক, ব্লগার, সাংবাদিক,
রাজনৈতিক বিশ্লেষক।।


