ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ কল্যাণের কাছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দাবি করা ৬৬৬ কোটি টাকা কর বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি রেজাউল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রুল খারিজ করে এ রায় দেন। ফলে আইন অনুযায়ী গ্রামীণ কল্যাণের কাছ থেকে ওই অর্থ আদায়ের পথ খুলে গেল এনবিআরের।
মামলাটির গুরুত্ব আরও বেড়েছে এ কারণে যে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রাষ্ট্রীয় রাজস্ব, কর প্রশাসন এবং তাঁর নিজের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরকারের আইনি বিরোধ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। যদিও ৬৬৬ কোটি টাকা আদায়ের বিষয়টি এনবিআরের কর দাবি এবং আদালতের রায়ের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়েছে, আদালত কোনোভাবেই এ অর্থকে সরকারের ‘দাবি’ হিসেবে নয়, বরং প্রচলিত কর আইনের আওতায় এনবিআরের দাবি হিসেবে বিবেচনা করেছেন।
এনবিআরের আইনজীবীর বক্তব্য অনুযায়ী, গ্রামীণ কল্যাণ ও গ্রামীণ টেলিকমের মধ্যে একটি চুক্তির আওতায় গ্রামীণ টেলিকম থেকে গ্রামীণ কল্যাণ আর্থিক সুবিধা পায়। গ্রামীণ টেলিকমের অর্জিত ডিভিডেন্ডের বিপরীতে গ্রামীণ কল্যাণকে ৪২ দশমিক ৫০ শতাংশ মুনাফা দেওয়ার বিষয়টি চুক্তিতে ছিল।
পরবর্তী সময়ে আয়কর কর্তৃপক্ষ গ্রামীণ কল্যাণের কর নথি পুনরায় পরীক্ষা করে দেখতে পায়, গ্রামীণ টেলিকম থেকে পাওয়া ওই আয়ের ওপর উৎসে কর কর্তনের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এ অবস্থায় কর কর্তৃপক্ষ কর দাবি করলে গ্রামীণ কল্যাণ এর বিরুদ্ধে আপিল ও পরে হাইকোর্টে রিট করে।
২০১৭ সালে এ বিষয়ে দুটি পৃথক রিট দায়ের করা হয়। মামলাগুলোতে ২০১২-১৩ থেকে ২০১৬-১৭ করবর্ষ পর্যন্ত কর দাবি নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়।
এর আগে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বিচারপতি মুহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকারের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চ গ্রামীণ কল্যাণের ওই দুটি রিট খারিজ করে রায় দিয়েছিলেন। তবে পরে একই বছরের ২৯ আগস্ট ওই রায় প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।
আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, বেঞ্চের দ্বিতীয় বিচারপতি এর আগে সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোতে সরকারপক্ষের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ফলে ওই বেঞ্চের রায় ত্রুটিপূর্ণ বা ‘ডিফেক্টিভ’ হওয়ার বিষয়টি সামনে আসে।
পরে মামলার নথি প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানো হয় এবং নতুন বেঞ্চে শুনানি হয়। দীর্ঘ শুনানি শেষে বৃহস্পতিবার নতুন বেঞ্চ রুল খারিজ করে এনবিআরের অবস্থান বহাল রাখেন।
রুল খারিজ হওয়ায় গ্রামীণ কল্যাণের করা রিট আর টিকল না। ফলে এনবিআর এখন আইন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে ৬৬৬ কোটি টাকা আয়কর বাবদ আদায়ের উদ্যোগ নিতে পারবে। এনবিআরের আইনজীবী জানিয়েছেন, এ জন্য যথাযথভাবে ডিমান্ড নোটিশ জারি করা হবে।
এ রায় একই সঙ্গে দেশের কর প্রশাসনের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ প্রভাবশালী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কর-সংক্রান্ত বিরোধে রাষ্ট্রের রাজস্ব দাবি আদালতের পরীক্ষায় কতটা টেকসই- এই মামলার রায় সে প্রশ্নেও গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
তবে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে তাঁর নিজের প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন বিষয়ে যে টানাপোড়েন ও বিতর্ক সামনে এসেছে, এই রায় সেই বিতর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে। সরকারের সময়কার প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, কর কর্তৃপক্ষের ভূমিকা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর আইনি অবস্থান- সবকিছুই এখন নতুন করে আলোচনায় আসছে।
গ্রামীণ কল্যাণের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার আবদুল্লাহ আল মামুন ও ব্যারিস্টার ফিদা এম কামাল। অন্যদিকে এনবিআরের পক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আব্দুস সামাদ আজাদ।


