একটি ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড- আর তাতেই যেন থমকে গেছে দেশের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। শিল্পকারখানার চাকা ধীর হয়ে এসেছে, হাজারো শ্রমিক কাজ হারানোর শঙ্কায়, রাজধানীর অসংখ্য বাসাবাড়িতে দিনের পর দিন জ্বলছে না চুলা। রান্না করতে না পেরে শিশুদের মুখে খাবার তুলে দিতে হিমশিম খাচ্ছেন মায়েরা। অন্যদিকে গ্যাসের অভাবে সিএনজি স্টেশনগুলোতে দেখা দিয়েছে দীর্ঘ লাইন, কোথাও আবার ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পরও মিলছে না জ্বালানি।
অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকেই দেশজুড়ে ভয়াবহ গ্যাস সংকট তৈরি হয়েছে। এতে প্রতিদিন প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ কোটি ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ কমে গেছে। ফলে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ ২৬৫ কোটি ঘনফুট থেকে নেমে এসেছে প্রায় ২২০ কোটি ঘনফুটে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশের শিল্প, বিদ্যুৎ, পরিবহন ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। গাজীপুর, আশুলিয়া, সাভার, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, টাঙ্গাইলসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলের শত শত কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। কোথাও গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে মেশিন চালানোই সম্ভব হয়নি। অনেক কারখানা পুরো দিন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে।
রাজধানীর মধুবাগের বাসিন্দা উম্মে হাবিবা জানান, দুই দিন ধরে তার বাসার চুলায় গ্যাস নেই। ছোট দুই সন্তানের জন্য খাবার রান্না করতে না পেরে তিনি চরম বিপাকে পড়েছেন। দোকানের খাবার দিয়ে শিশুদের প্রয়োজন মেটানো সম্ভব নয় বলেও জানান তিনি।
মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা শামসুর রহমান বলেন, তিন দিন ধরে বাসায় গ্যাস নেই। বাধ্য হয়ে এলপিজি সিলিন্ডার কিনে রান্নার ব্যবস্থা করেছেন। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “তিতাসকে গ্যাসের বিলও দেব, আবার রান্নার জন্য আলাদা সিলিন্ডারও কিনব- এভাবে সাধারণ মানুষ কতদিন চলবে?”
গ্যাস সংকটের সবচেয়ে করুণ চিত্র দেখা গেছে রাজধানীর সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে। কুড়িল বিশ্বরোডের একটি স্টেশনে গ্যাস না থাকায় সারাদিনই সেবা বন্ধ ছিল। অনেক চালক ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও খালি হাতে ফিরে গেছেন। কাওরান বাজারের একটি স্টেশনে থ্রি-হুইলার চালক আব্দুল হামিদ বলেন, “চার ঘণ্টার বেশি সময় ধরে লাইনে আছি। একটু গ্যাস এলেই চাপ শেষ হয়ে যায়। এভাবে সারাদিন বসে থাকতে হচ্ছে।”
গ্যাসের সংকট শুধু রান্নাঘর বা পরিবহনেই সীমাবদ্ধ নয়, বিদ্যুৎ উৎপাদনেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ফলে বৃষ্টির মধ্যেও দেশের বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং বেড়েছে। এতে জনজীবনের দুর্ভোগ আরও তীব্র হয়েছে।
পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত এলএনজি টার্মিনালের মেরামতের কাজ শেষ পর্যায়ে। যুক্তরাজ্য থেকে আসা প্রকৌশলীরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন। সবকিছু ঠিক থাকলে শুক্রবার সন্ধ্যা বা রাতে টার্মিনালটি সীমিত পরিসরে চালু হতে পারে। তবে নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত পূর্ণমাত্রায় এলএনজি সরবরাহ শুরু করা হবে না।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকট বাংলাদেশের গ্যাস খাতের দুর্বলতাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। দেশের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট হলেও সরবরাহ হচ্ছে তার অনেক কম। স্থানীয় গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদনও ধারাবাহিকভাবে কমছে। অন্যদিকে ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার কারণে সামান্য দুর্ঘটনাতেই পুরো দেশের জ্বালানি ব্যবস্থা বিপর্যয়ের মুখে পড়ে।
একটি টার্মিনালের অগ্নিকাণ্ড যেন পুরো দেশের কোটি মানুষের জীবনকে স্থবির করে দিয়েছে। চুলায় আগুন নেই, কারখানায় উৎপাদন নেই, সিএনজি পাম্পে গ্যাস নেই, অসহায় মানুষের একটাই প্রশ্ন, স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে আর কতদিন অপেক্ষা করতে হবে?


