টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার মৎস্য খাত কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। আহরণের ঠিক আগমুহূর্তে বেড়িবাঁধ ভেঙে এবং দীর্ঘদিন অচল থাকা স্লুইসগেটের কারণে কোটি কোটি টাকার চিংড়ি ও বিভিন্ন প্রজাতির মাছ বঙ্গোপসাগরে ভেসে গেছে। উপজেলা মৎস্য বিভাগের প্রাথমিক হিসাবে, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ইতোমধ্যে ৫১ কোটি ৬৩ লাখ ৮৪ হাজার টাকা ছাড়িয়েছে। তবে এখনো অনেক এলাকায় পানি না নামায় প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ মেরামত এবং অচল স্লুইসগেট সচল করার দাবি জানানো হলেও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সময়মতো রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সংস্কার না থাকায় সামান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগই ভয়াবহ বিপর্যয়ে রূপ নিয়েছে। ফলে শত শত মাছচাষির দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ এক নিমিষেই পানিতে ভেসে গেছে।
ছনুয়ার মধুখালী এলাকার দুটি পানি নিষ্কাশন গেটের একটি দীর্ঘদিন ধরে অচল থাকায় বন্যার পানি দ্রুত নামতে পারেনি। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁশখালী উপবিভাগের প্রকৌশলী অনুপম পালও স্বীকার করেছেন, অচল স্লুইসগেটের কারণে বসতবাড়ির পাশাপাশি মাছের ঘের ও কৃষিজমি দীর্ঘ সময় পানির নিচে ছিল।
সরেজমিনে ছনুয়া, গন্ডামারা, শেখেরখীল, সরল ও খানখানাবাদ ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ মাছের ঘের এখনো পানির নিচে। কোথাও বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে, কোথাও পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা অকার্যকর। এতে কোটি কোটি টাকার মাছ ও চিংড়ি ভেসে গিয়ে স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে।
মাছচাষি আমিনুর রহমান জানান, ৩৫ একর ঘেরে প্রায় দেড় কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন, যার মধ্যে ৬০ লাখ টাকা ঋণ। ১২ দিন ধরে ঘের পানির নিচে থাকায় সব মাছ ভেসে গেছে। সরকারি সহায়তা ছাড়া ঋণ পরিশোধ সম্ভব নয় বলে তিনি জানান।
একই এলাকার আরেক চাষি সরওয়ার বলেন, ৮০ একর জমিতে প্রায় ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে চিংড়ি চাষ করেছিলেন। আরও দুই মাস পর মাছ বিক্রি করলে ৬০ থেকে ৭০ লাখ টাকা পাওয়ার আশা ছিল। কিন্তু সব শেষ হয়ে গেছে।
আবুল কালাম, শোয়েব ও আবদুল মজিদের মতো অসংখ্য চাষির অভিযোগ, নিজেদের অর্থে ভাঙা বাঁধ মেরামতের চেষ্টা করলেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর সরকারি সহায়তা পাননি।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় ৩১০টি চিংড়ি ঘের এবং ৪ হাজার ২০০টি মাছের পুকুর ও দিঘি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় ৯৮৩ মেট্রিক টন মাছ এবং ৫৬৩ মেট্রিক টন চিংড়ি পানিতে ভেসে গেছে।
এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের দাবি, দ্রুত আর্থিক প্রণোদনা, সহজ শর্তে ঋণ পুনঃতফসিল, ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ ও অচল স্লুইসগেটের জরুরি সংস্কার এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা না হলে বাঁশখালীর অন্যতম প্রধান মৎস্য খাত দীর্ঘমেয়াদি সংকটে পড়বে। তাদের মতে, সময়মতো অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণ ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা থাকলে এত বড় ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হতে পারত।


