হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পে ভয়াবহ আর্থিক অনিয়ম, অস্বাভাবিক ব্যয় এবং সরকারি অর্থ অপচয়ের একের পর এক অভিযোগ সামনে এসেছে। মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে-প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই প্রায় ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয় করেছে বিএনপির ঠিকাদার গ্রুপ। একই সঙ্গে ৫০০ টাকার গাছ লাখ টাকায় কেনা, আংশিক উদ্বোধনের ফিতা কাটতে ৪৪ কোটি টাকা ব্যয় এবং বিদ্যমান জলাশয়কে নতুন পুকুর দেখিয়ে ১০ কোটি টাকা বিল পরিশোধসহ একাধিক অনিয়মের তথ্য প্রকাশ পেয়েছে।
নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করার অজুহাতে বিএনপির ঠিকাদারকে অতিরিক্ত ২১৭ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ৬৩০টি আইটেম পরিবর্তন (ভেরিয়েশন) দেখিয়ে যথাযথ অনুমোদন ছাড়াই শত শত কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। এখন এসব ব্যয়কে পরবর্তী সময়ে (পোস্ট-ফ্যাক্টো) অনুমোদনের মাধ্যমে বৈধতা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ ধরনের সিদ্ধান্ত সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, অনিয়মকে পরবর্তী অনুমোদনের মাধ্যমে বৈধতা দেওয়া হলে সেটি নিজেই আরেকটি দুর্নীতির শামিল হবে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, থার্ড টার্মিনালের সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য ঝাউ, কৃষ্ণচূড়া ও কাঠগোলাপসহ বিভিন্ন গাছের প্রতিটির মূল্য ৫ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা দেখানো হয়েছে। অথচ স্থানীয় নার্সারিতে একই ধরনের গাছ ২০০ থেকে ৫০০ টাকায় পাওয়া যায়। শুধু গাছ কেনাতেই প্রায় ২০ কোটি টাকা এবং পরিচর্যার নামে আরও ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে।
এছাড়া গুগল আর্থের পুরোনো স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রকল্প এলাকায় আগে থেকেই একটি জলাশয় ছিল। সেটিকে সংস্কার করেই নতুন পুকুর নির্মাণের বিল হিসেবে ১০ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। মাটি পরিবহনের ক্ষেত্রেও প্রকৃত দূরত্বের তুলনায় বেশি দূরত্ব দেখিয়ে ৮৩ কোটি টাকা ব্যয় দেখানোর অভিযোগ রয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছে, প্রকল্পের মূল চুক্তিতে না থাকা সত্ত্বেও আংশিক উদ্বোধন (সফট ওপেনিং) অনুষ্ঠানের জন্য ৪৪ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। পাশাপাশি ডিজেল পাম্প, ইউপিএস, জ্বালানি তেল, ওভারটাইম বিল, কনটিনজেন্সি খাত এবং অন্যান্য ব্যয়ের ক্ষেত্রেও একাধিক প্রশ্নবিদ্ধ অর্থ পরিশোধের তথ্য পাওয়া গেছে।
সাবেক বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) মোহাম্মদ মফিদুর রহমান বলেছেন, নিরীক্ষায় উত্থাপিত প্রতিটি অভিযোগ প্রকল্পের নথি ও চুক্তির আলোকে নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
এদিকে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নিরপেক্ষ তদন্ত হলে পর্দার আড়ালে থাকা বিএনপির অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম বেরিয়ে আসতে পারে। তার মতে, প্রকল্পের বাকি কাজ চলমান রেখেই তদন্ত সম্পন্ন করা সম্ভব এবং রাষ্ট্রীয় অর্থ লুটপাটের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা জরুরি।


