পাকিস্তানের খনিজসম্পদসমৃদ্ধ বেলুচিস্তান আবারও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রে। মানবাধিকারকর্মী ও চিকিৎসক মাহরাং বালুচকে সন্ত্রাসবাদ, রাষ্ট্রদ্রোহ ও হত্যার অভিযোগে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়ার পর প্রদেশজুড়ে বিক্ষোভ, সংঘর্ষ ও স্বাধীনতার দাবিতে আন্দোলন নতুন মাত্রা পেয়েছে। বেলুচদের অভিযোগ, এটি রাজনৈতিক ভিন্নমত দমনের ধারাবাহিকতা; অন্যদিকে পাকিস্তান সরকারের দাবি, বিচ্ছিন্নতাবাদ ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় আইনানুগ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
বেলুচিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতি ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে-দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বঞ্চনা, অর্থনৈতিক বৈষম্য, জোরপূর্বক গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ এবং রাষ্ট্রীয় দমননীতি এই অঞ্চলকে এমন এক সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যার সঙ্গে বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের পূর্ববর্তী সময়ের কিছু ঐতিহাসিক সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়।
মাত্র ৩৩ বছর বয়সী মাহরাং বালুচ গত কয়েক বছরে বেলুচ জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ের আন্দোলনের অন্যতম প্রতীক হয়ে উঠেছেন। তার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা বালুচ ইয়াকজেহতি কমিটি শান্তিপূর্ণ গণআন্দোলন, গুমের শিকার পরিবারগুলোর ন্যায়বিচার এবং মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে ব্যাপক জনসমর্থন অর্জন করে। তবে এসব কর্মকাণ্ডের জেরেই তিনি একাধিকবার গ্রেপ্তার, হয়রানি ও মামলার মুখোমুখি হন। সর্বশেষ আদালতের রায়ে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হলে বেলুচিস্তানে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।
রায়ের পর স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠীগুলো পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলার দাবি করেছে। তাদের বক্তব্য, প্রদেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় সরকারি নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং স্থানীয় জনগণ নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের দাবিতে আরও ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে।
বেলুচিস্তান পাকিস্তানের আয়তনের বৃহত্তম এবং প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ অঞ্চল হলেও উন্নয়ন সূচকে এটি দীর্ঘদিন ধরেই পিছিয়ে। স্থানীয়দের অভিযোগ, গ্যাস, সোনা, তামা, কয়লাসহ বিপুল সম্পদ কেন্দ্রীয় সরকার ব্যবহার করলেও বেলুচ জনগণ ন্যায্য অংশ থেকে বঞ্চিত। এই বৈষম্যই স্বাধীনতার দাবিকে আরও তীব্র করেছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থা বহুবার বেলুচিস্তানে জোরপূর্বক গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং রাজনৈতিক কর্মীদের বিরুদ্ধে কঠোর দমন-পীড়নের অভিযোগ তুলে নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে। তবে পাকিস্তান সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, সন্ত্রাসবাদ ও সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদ দমনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
মাহরাং বালুচের ব্যক্তিগত জীবনও এই আন্দোলনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তার বাবা আব্দুল গাফফার লাঙ্গোভ নিখোঁজ হওয়ার দুই বছর পর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরিবারের দাবি, তিনি নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে গুমের শিকার হন। একইভাবে তার ভাইও একসময় আটক হয়ে কয়েক মাস পর মুক্তি পান। এসব অভিজ্ঞতাই মাহরাংকে মানবাধিকার আন্দোলনের সামনের সারিতে নিয়ে আসে।
বেলুচিস্তানের চলমান ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকগণ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধপূর্ব সময়ের সঙ্গে ঐতিহাসিক মিলের কথা উল্লেখ করছেন।
সব মিলিয়ে বেলুচিস্তান আজ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম স্পর্শকাতর রাজনৈতিক সংকটে পরিণত হয়েছে। স্বাধীনতার দাবি, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা অভিযান এবং আন্তর্জাতিক নজরদারির মধ্য দিয়ে অঞ্চলটির ভবিষ্যৎ কোন দিকে মোড় নেবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।


