মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, বিশ্ববাজারে অনিশ্চয়তা এবং খাদ্যপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম আমদানিতে বাংলাদেশের বাড়তি ব্যয়ের হিসাব সামনে এসেছে। বিকল্প উৎস কিংবা আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের গম কিনতে টনপ্রতি প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ ডলার বেশি ব্যয় হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের হিসাব।
চলতি অর্থবছরে প্রায় ৮ লাখ টন গম যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানির ক্ষেত্রে এই অতিরিক্ত দামের কারণে বাংলাদেশের বাড়তি ব্যয় দাঁড়াতে পারে ৫ কোটি ২০ লাখ থেকে ৫ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৬২৪ কোটি থেকে ৬৭২ কোটি টাকা। এমনকি সাম্প্রতিক উন্মুক্ত দরপত্রে পাওয়া সর্বনিম্ন দরের সঙ্গে তুলনা করলেও অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ কমপক্ষে প্রায় ৩২৭ কোটি টাকা হতে পারে বলে হিসাব করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে গম আমদানিকে কেন্দ্র করে যে সমঝোতা ও ক্রয়চুক্তি হয়েছে, তার আওতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিপুল পরিমাণ গম কেনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। গম সরবরাহে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে সিঙ্গাপুরভিত্তিক Agrocorp International, যা US Wheat Associates-এর অনুমোদিত সরবরাহকারী হিসেবে বিভিন্ন সরকারি ক্রয়চুক্তিতে যুক্ত রয়েছে।
সরকারি নথি ও সাম্প্রতিক ক্রয়সংক্রান্ত প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিভিন্ন দফায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২ লাখ ২০ হাজার টন করে গম কেনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে ২ লাখ ২০ হাজার টন গম আমদানির জন্য টনপ্রতি ৩০৮ ডলার দরে মোট প্রায় ৮২৫ কোটি টাকা ব্যয় অনুমোদিত হয়। পরবর্তী আরেক দফায় একই পরিমাণ গমের দাম নির্ধারণ করা হয় টনপ্রতি ৩১২ দশমিক ২৫ ডলার। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের গম আমদানিতে শুধু পণ্যের মূল্য নয়, পরিবহন, বীমা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনামূলক হিসাব অনুযায়ী, রাশিয়া ও কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চল থেকে আমদানি করা গম তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যাচ্ছে। বাংলাদেশে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে এসব উৎসের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের গমের মোট ব্যয়ের ব্যবধান আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চল থেকে বাংলাদেশে গমের চালান পৌঁছাতে যেখানে প্রায় ১৫ দিন সময় লাগে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে চালান পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় ৫৫ দিন। দীর্ঘ সমুদ্রপথের কারণে জাহাজভাড়া, বীমা এবং পরিবহন ব্যয়ও তুলনামূলক বেশি হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
ফলে প্রশ্ন উঠছে- দেশের খাদ্যনিরাপত্তার জন্য গমের মজুত নিশ্চিত করার পাশাপাশি কেন তুলনামূলক কম ব্যয়ে বিকল্প উৎস থেকে গম কেনার সুযোগকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে না?
গম আমদানিতে উন্মুক্ত দরপত্র ব্যবস্থায় বিভিন্ন দেশের সরবরাহকারীরা প্রতিযোগিতা করার সুযোগ পান। এতে সর্বনিম্ন গ্রহণযোগ্য দরদাতার কাছ থেকে পণ্য কেনার সুযোগ থাকে। অন্যদিকে নির্দিষ্ট উৎস থেকে চুক্তিভিত্তিক আমদানির ক্ষেত্রে সেই প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা সীমিত হয়ে যায়।
সাম্প্রতিক সরকারি ক্রয়ের তথ্যেও যুক্তরাষ্ট্রের গমের দাম টনপ্রতি ৩০০ ডলারের বেশি দেখা গেছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে ২ লাখ ২০ হাজার টন মার্কিন গমের জন্য টনপ্রতি ৩০৮ ডলার এবং ডিসেম্বরে একই পরিমাণ গমের জন্য ৩১২ দশমিক ২৫ ডলার নির্ধারণ করা হয়েছিল।
এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক বাজারের বিকল্প দর এবং উন্মুক্ত দরপত্রে পাওয়া দরের সঙ্গে তুলনা করে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আর্থিক সুবিধা-অসুবিধা নতুন করে মূল্যায়নের দাবি উঠছে।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম আমদানির বিষয়টি দুই দেশের বৃহত্তর বাণিজ্য সম্পর্কের সঙ্গেও যুক্ত। ২০২৫ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ভারসাম্য ও শুল্ক-সুবিধার আলোচনার প্রেক্ষাপটে মার্কিন গম আমদানির পরিমাণ বাড়ানোর সমঝোতা হয়েছিল।
অর্থাৎ গম আমদানির সিদ্ধান্তকে শুধু খাদ্যপণ্য কেনাবেচা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। এর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, শুল্ক সুবিধা, আমদানি প্রতিশ্রুতি এবং বৈদেশিক বাণিজ্যনীতির বৃহত্তর সমীকরণও জড়িত।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলমের মতে, চুক্তির কাঠামোর কারণে গমের দাম নিয়ে বাংলাদেশের দর-কষাকষির সুযোগ সীমিত হয়ে থাকলে সেটি দেশের স্বার্থে পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নির্দিষ্ট উৎস থেকে বাধ্যতামূলকভাবে পণ্য কেনার ফলে বাজারের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা হারানোর ঝুঁকি থাকে।
তবে চুক্তির পূর্ণাঙ্গ আর্থিক শর্ত, মূল্য নির্ধারণের সূত্র, পরিবহন ব্যয় এবং বিকল্প উৎসের একই মানের গমের তুলনামূলক মূল্য প্রকাশ্যে বিশ্লেষণ না করা পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যয়ের পুরো চিত্র নির্ধারণ করা কঠিন।
চলতি অর্থবছরে ৮ লাখ টন গম আমদানিতে টনপ্রতি ৬৫-৭০ ডলার বেশি ব্যয় হলে অতিরিক্ত অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় আনুমানিক ৫ কোটি ২০ লাখ থেকে ৫ কোটি ৬০ লাখ ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৬২৪ থেকে ৬৭২ কোটি টাকা।
এই অর্থ খাদ্য মজুত বাড়ানোর ব্যয়ের অংশ হলেও তুলনামূলক কম দামে একই মানের গম কেনার সুযোগ থাকলে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই। বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ এবং আমদানি ব্যয় যখন অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তখন দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য আমদানি চুক্তিতে মূল্য, মান, পরিবহন ব্যয়, বিকল্প বাজার এবং চুক্তির বাধ্যবাধকতা- সবকিছু প্রকাশ্য যাচাইয়ের আওতায় আনা জরুরি হয়ে উঠেছে।
ফলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম আমদানির এই চুক্তি এখন কেবল খাদ্যনিরাপত্তার বিষয় নয়; এটি সরকারি অর্থের দক্ষ ব্যবহার, আন্তর্জাতিক দরপত্রের প্রতিযোগিতা এবং বাংলাদেশের বাণিজ্যিক স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত হচ্ছে- সেই বৃহত্তর প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে।


